হোম » টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক মসজিদ

টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক মসজিদ

খান মাহবুব

খান মাহবুব

 স্থলভূমির উন্মেষ টাঙ্গাইলে অনেক প্রাচীন। ময়নামতি ও পাহাড়পুরের সমসাময়িক কালেই এই ভূখণ্ডে উত্তর-পূর্ব ভারতের শংকর কোনো জাতিগোষ্ঠীর জনপদ গড়ে উঠেছিল। মধ্যযুগে সারা বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য স্থাপত্য ইমারত নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এ সম্বন্ধে কোনো নিয়মানুগ গবেষনা না থাকায় ও অঞ্চলভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন না হওয়ায় এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন আমাদের অনেকের কাছেই অজানা। বাংলাদেশ মুসলিম (মধ্যযুগ) শিল্প-ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত এখানকার স্থাপত্য ঐতিহ্য জাতির প্রাণসত্তাকে উদ্ভাসিত করে। টাঙ্গাইল জেলায় মুসলিম স্থাপত্য সারা জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। শাহ্ বাবা আদম কাশ্মিরির মাজারে প্রাপ্ত লিপি থেকে জানা যায়, পনের শতকের আগেই আটিয়া পরগণাতে মুসলমানদের আগমন ঘটে। মূলত আটিয়া পরগণা কেন্দ্রিক মুসলিম স্থাপত্য স্থাপনের সূচনা হলেও পরে তা সমগ্র জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। টাঙ্গাইলের কয়েকটি মুসলিম স্থাপত্য নির্দশনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে তুলে ধরা হলো :

ধনবাড়ি মসজিদ

আটিয়া মসজিদ-দেলদুয়ার উপজেলা: টাঙ্গাইলের প্রত্ন-নিদর্শনের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আটিয়া জামে মসজিদ। টাঙ্গাইল শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে দেলদুয়ার উপজেলায় এর অবস্থান। আটিয়া পরগণার শাসক সাঈদ খান পন্নী ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। এই সাঈদ খান পন্নীই করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। আটিয়া মসজিদ দেলদুয়ার উপজেলা তথা টাঙ্গাইল জেলার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ। সুলতানি ও মোগল আমলের স্থাপত্য শিল্পরীতির সমন্বয়ে নির্মিত এ মসজিদের পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজে নিযুক্ত ছিলেন দিল্লীর প্রখ্যাত স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ।

এ মসজিদটি নির্মাণের পর ১৯০৯ সালে আবুল আহমেদ খান গজনবী ও ১৯৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরাণী সংস্কার করেন।

মসজিদটি কিবলাকোটা ও বারান্দাসহ সার্বিক পরিমাণ ১৭.৭০ মিঃ * ১২ মিটার। মসজিদের দেয়াল ২.২২ মিটার প্রশস্ত। বারান্দা ৩.৮২ মিটার * ৭.৫ মিটার। সুলতানি ও মোগল আমলের স্থাপত্য শিল্পরীতির সুষম সমন্বয় এ মসজিদে চারকোণে চারটি বিরাট অষ্টকোণাকৃতির মিনার রয়েছে। মিনারগুলো ছাদের অনেক উপরে উঠে ছোট গম্বুজে শেষ হয়েছে। এ মসজিদে সুলতানি স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট যেমন বক্রাকার কার্ণিশ, দ্বিকেন্দ্রিক সুচালো খিলান, গম্বুজ নির্মাণে বাংলা পান্দানতিভ ব্যবহার এবং উল্লেখযোগ্যভাবে পোড়ামাটির টেরাকোটা নকশালংকার।

বাংলাদেশের যে সকল মুসলিম স্থাপত্যিক ঐতিহ্য রয়েছে তার মধ্যে আটিয়া জামে মসজিদ একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। টাঙ্গাইল অঞ্চলে প্রাপ্ত শিলালিপিগুলোর মধ্যে আটিয়া জামে মসজিদে প্রাপ্ত একটি আরবি একটি ফার্সি শিলালিপি রয়েছে এর মাধ্যমে মসজিদের নির্মাণ সময়কাল ও পূর্বের কিছু অসংগতির সমাধান পাওয়া যায়।

পাকুল্লা মসজিদ-মির্জাপুর উপজেলা: ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে এই মসজিদ নির্মিত হয়। পাকুল্লা মসজিদটি বাংলাদেশে মোগল আমলে নির্মিত আয়তাকৃতির তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ শ্রেণির অর্ন্তভুক্ত। এর ভূমি-নকশা, নির্মাণ কৌশল, স্থাপত্য রীতি ও অলংকরণ শৈলীর উপর ভিত্তি করে একে পরবর্তী মোগল আমলের (late medieval) মসজিদ বলে মনে হতে পারে। মসজিদের আভ্যন্তরীণ পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণ ১৩.৬৫ মিটার এবং পূর্ব পশ্চিমে ৪.৬৭ মিটার। পাকুল্লা মসজিদের দেয়াল ১.২৫ মিটার প্রশস্ত।  মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণপার্শ্বস্থ দুটি ছোট দোচালা কক্ষ। মতিবিবি নামক এক মহিলা এই মসজিদ নির্মাণ করেন। যা মসজিদ স্থাপত্য রীতিতে নতুন সংযোজন। মসজিদের মেঝে শ্বেতপাথর দ্বারা তৈরি। মিশর ও ইরানী শিল্পীরা এই মসজিদ নির্মাণ করেন। শ্বেতপাথর আনা হয়েছিল মিশর হতে। পাকুল্লা মসজিদটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন। কিছুকাল পূর্বেও এর সংস্কার করা হয়। বাইরে একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে গিয়ে এর ফাসাদে যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বর্তমানে এ কাঠামো তৈরি বন্ধ রয়েছে। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং অতিদ্রুত এর সংস্কার সাধন প্রয়োজন।

ধনবাড়ী মসজিদ: ধনবাড়ী উপজেলার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অন্যতম নির্দশন হলো ধনবাড়ী মসজিদ। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ধনপতি সিংহকে পরাজিত করে মুঘল সেনাপতি ইস্পিঞ্জর খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ধনবাড়ীতে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও জমিদারি প্রতিষ্ঠা নিয়ে অন্য জনশ্রুতিও রয়েছে। এই মোগল প্রতিনিধি ছিলেন ধনবাড়ী মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। মসজিদটি ধনবাড়ী নবাব মঞ্জিলের বাইরে দিঘির পাড়ে অবস্থিত। মোগল স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত মসজিদটির আকার- অবয়বে বেশ কবার পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। তারপরেও অপূর্ব কারুকার্য-খচিত মসজিদটি যে কারো মনযোগ আকর্ষণ করে। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ লাগোয়া সুদৃশ্য ও জাঁকজমকপূর্ণ একটি মিনার রয়েছে। মসজিদকে কেন্দ্র করে মানত প্রথা প্রচলিত রয়েছে।

মসজিদটি প্রায় দশকাঠা জমির উপরে অবস্থিত। আদি মসজিদটি ছিল আয়তাকার। তখন এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৩.৭২ মিটার (৪৫ ফুট) এবং প্রস্থ ছিল ৪.৫৭ মিটার (১৫ ফুট) কিন্তু সংস্কারের পর মসজিদটির আকার রীতিমত পরিবর্তিত হয়ে যায় যা শুধু বিভ্রান্তিকর নয় বরং কিছুটা অসঙ্গতিপূর্ণ। সংস্কারের পর বর্তমানে এর অনেক বৈশিষ্ট্যই ভিন্ন আঙ্গিক গ্রহণ করেছে, সেসাথে এর প্রাচীনত্ব লুপ্ত হয়েছে এবং চাকচিক্য অনেক বেড়েছে। সুন্দর কারুকার্যময় এ মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশপথ। এ ছাড়া, উত্তর ও দক্ষিণে আরো একটি করে সর্বমোট পাঁচটি প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদটি বর্ধিতকরণ ও সংস্কার সাধনের পরেও এর উপরস্থ তিনটি গম্বুজ ও পাঁচটি প্রবেশপথে প্রাচীনত্বের ছাপ লক্ষ করা যায়।

এ ছাড়া, সওদাগরি মসজিদ (আটিয়া মসজিদ সংলগ্ন) কালিহাতি উপজেলার কদিম হামজানি মসজিদ, দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি মসজিদ, করটিয়া মসজিদ টাঙ্গাইলের অনন্য মুসলিম ঐতিহ্য।

 লেখক- গবেষক, প্রাবন্ধিক ও প্রকাশক