হোম » প্রাগৈতিহাসিক চট্টগ্রাম এবং কিছু প্রাচীন কথা

প্রাগৈতিহাসিক চট্টগ্রাম এবং কিছু প্রাচীন কথা

প্রাগৈতিহাসিক চট্টগ্রাম এবং কিছু প্রাচীন কথা

সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ

সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ

ইতিহাসের বিস্ময় :

চট্টগ্রামের প্রাগৈতিহাসিক সময়ের ভৌগোলিক অবস্থাটা কি রকম ছিল এনিয়ে বাঙালি পণ্ডিতদের অনেকেরই মূল্যবান লেখাজোখা আছে| তবে হাল আমলে ভূতত্ত্ববিদ, নৃতাত্ত্বিক ও পুরাতত্ত্ববিদদের এনিয়ে লেখালেখি খুব একটা চোখে পড়ে না| একেতো হাজার বছর অতীতের চট্টগ্রাম এবং তার ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস নিয়ে বিস্ময়ের শেষ নেই| তার ওপর আছে হিস্টোরিক্যাল এভিডেন্স এবং ইনফারেন্সের নানা কথা কাটাকাটি| সংবাদপত্রে মাঝেমাঝে গবেষকদের অনেক আবিষ্কারের খবর বিস্ময়ের ঘোর লাগিয়ে দেয়| উয়ারি বটেশ্বরে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের খবরে যেমনি আমরা মাঝেমাঝে বিস্ময়াভিভূত হই| তেমনি একটি খবর সম্প্রতি সংবাদপত্রের পাতায় এসেছে| তা-হলো  লেবানন, ইসরাইল, জর্ডান ও সিরিয়া অঞ্চলে যে প্রাচীন মানব বসতি ছিল, সম্প্রতি সেখানে মিলেছে সুপ্রাচীন যুগে তৈরি রুটির সন্ধান| পুরাতত্ত্ববিদরা বলছেন, যেসব রুটি উৎখননে আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলো এমন সময়ের, যখন ওই সময়ের মানুষেরা কৃষিকাজ করতে জানতোই না| গবেষকরা বলছেন, ওইসব রুটি তখনকার মানুষেরা উত্তপ্ত পাথরের ওপর সেঁকে তারপর খেতো| ধরে নেওয়া যায়, ওইসব রুটির উপাদান নিশ্চয়ই আকাশ থেকে আসেনি| প্রাচীনকালের অকর্ষিত বনজঙ্গলে বুনো গম, ভুট্টা, ডাল, কলই এবং বিভিন্ন জাতের শিম ও ধানের সন্ধান মিলতো| সেগুলো শুকিয়ে গুঁড়ো বা চূর্ণ করে তা থেকে রুটি বানানোর চেষ্টা মানুষেরা করে থাকতে পারে| তবে বিস্ময়ের মূল বার্তাটি হলো পুরাতাত্ত্বিকরা বলছেন, কৃষিকাজ শুরু করার আগেই পৃথিবীর মানুষেরা রুটি বানিয়েছিল| এ প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের কথা হচ্ছে : ‘এভাবে মানুষ একদিকে যেমন তার চিন্তা ও শ্রমের পরিবেশকে বদলে নিয়েছে, আবার অন্যদিকে পরিবেশও তার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে| মানুষের প্রত্যেক সাফল্যই প্রকৃতির ওপর নতুন অধিকার- নতুন বিজয়| মানুষের প্রথম জন্ম উষ্ণপ্রদেশে; কিন্তু আহার্যের খোঁজে তাকে শীতলতম দেশে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়| সেখানকার জলবায়ু তখন তাকে আবাস ও পরিচ্ছদ নির্মাণে বাধ্য করে| এভাবে শ্রমের  নতুন পদ্ধতি স্তরে স্তরে মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে দেয়| (মানব সমাজ, ভূমিকা ও সম্পাদনা: যতীন সরকার, ঢাকা, ২০১১)|

পৃথিবীর অধিকাংশ পণ্ডিতই এবিষয়ে একমত যে, প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে বিবর্তনের ধারায় প্রায় সোজা হয়ে দাঁড়ানো নিয়ানডার্থাল জাতীয় মানুষ পৃথিবীতে বিচরণ করতো| তারা মোটামুটি কাজে লাগে এমন  অপেক্ষাকৃত কার্যকর হাতিয়ার, অস্ত্র ইত্যাদি পাথর, হাড়, কাঠ ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে বানাতে সক্ষম হয়েছিল| তারও চেয়ে বেশি উন্নত শরীর কাঠামো, শক্তি ও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের বিকাশ ঘটে যিশু খ্রিষ্টের জন্মের বিশ হাজার বছর আগে| এসময়কার মানুষের নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা ‘অরিগনেশিয়ান মানব’| পৃথিবীব্যাপী চতুর্থ হিমযুগ তখনও চলমান থাকায় এসব মানুষের আশ্রয়স্থল ছিল পাহাড়ের গুহা এবং পাথুরে আচ্ছাদন সমূহে| আজকের আধুনিক যুগে পৃথিবীর নানাপ্রান্তে গুহার দেয়ালে, পাথরের গায়ে লাল-কালো রং দিয়ে আঁকা যে সব গুহাচিত্র বা কেইভ আর্ট দেখা যাচ্ছে তা এসব মানুষেরই কীর্তি বলে গবেষকদের ধারণা| এই মানুষেরাই পশুর চামড়া দিয়ে পোশাক তৈরি এবং সেলাই-ফোঁড় সূচিকর্মে দক্ষতা দেখাতে শুরু করে| তারা ছবি আঁকে কাঠ, পাথর ও হাড়ের ওপরে| কারো কারো মতে, খ্রিষ্টের জন্মের দশ হাজার বছর আগে, অন্যদিকে রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, আট হাজার খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে সর্বশেষ হিমযুগ বা ‘ফোর্থ গ্রেট গ্লেশিয়াস এরার সমাপ্তি ঘটে| এই সর্বশেষ হিমযুগের অবসানের অর্থ হলো প্রাচীন প্রস্তর যুগের সমাপ্তি| অরিগনেশিয়ানরা বরফ অপসৃত ইয়োরোপে জেগে উঠা নতুন বনভূমির দিকে এগিয়ে এলো|  সারা পৃথিবীতে তৃণভূমিগুলো আবার সবুজ প্রান্তরের সৃষ্টি করে| বরফমুক্ত পৃথিবীতে যখন পশুরাও চারধারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, গুহা ছেড়ে আসা মানুষেরাও তাদের অনুসরণ করতে থাকে| পণ্ডিত রাহুল এসব মানুষদের ‘মাংসাহারী’ আখ্যায়িত করেছেন| এই হিমযুগমুক্ত পৃথিবীতেই অরিগনেশিয়ান মানুষেরা নতুন প্রস্তর যুগের সূচনা করে| সকল পণ্ডিতেরাই বলছেন, এই সময় থেকে কৃষি ও ধাতু আবিষ্কারের সূচনা হয়| এই সময়ে মানুষ পৃথিবীর প্রায় সকল অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছিল বলে প্রমাণ মেলে|

বর্তমানে চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের যে ভৌগোলিক অবয়ব, লক্ষ বছর আগে এরকমটি না থাকারই কথা| এ প্রসঙ্গে ইতিহাসের আরো একটি বিস্ময়কর তথ্য আমরা স্মরণ করতে পারি| যা রাহুল সাংকৃত্যায়ন তার লেখায় তুলে ধরেছেন| তা হলো ডক্টর বীরবল সাহনীর গবেষণাজাত একটি সিদ্ধান্ত| সাহনীর অভিমত হচ্ছে, প্রাচীন প্রস্তর যুগে অর্থাৎ চতুর্থ হিমযুগের সময়কালে হিমালয় পর্বতের এপার থেকে ওপার মানুষেরা অনায়াসে যাতায়াত করতে পারতো| কারণ প্রাচীন হিমালয়ের উচ্চতা বর্তমান হিমালয়ের উচ্চতার অর্ধেক ছিলো| তাহলে হিমালয় এতোটা উঁচু হলো কি করে এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে| ধারণা করা যায়, লক্ষ-হাজার বছর আগের কোনো এক সময় পৃথিবীর আন্তঃমহাদেশীয় প্লেট বা টেকটোনিক প্লেটগুলোর মধ্যে অন্তত দুটির সংঘর্ষে হিমালয়সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক চেহারার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছিল| হিমালয় আরও উঁচু হয়ে উঠেছিল, সৃষ্টি হয়েছিল হিমালয়ান রেঞ্জের| বহু সমভূমি সংযুক্ত পাহাড়-টিলায় রূপান্তরিত হয়েছিল| সমুদ্র-উদরের বহু পাহাড়টিলা মাথা উঁচু করে জেগে উঠেছিল| আবার বহু সমতলভূমি সমুদ্র গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিল| চট্টগ্রাম একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের অতি নিকটেই অবস্থিত| আসাম প্লেট এবং মিয়ানমার প্লেটের বিচ্যুতির কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্পে এখানে ভৌগোলিক পরিবর্তনের নানা ঘটনা আছে| ভারতবর্ষে বিগত তিন চারশ’ বছরের ইতিহাসে ভূমিকম্পে বহু নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ারও ঘটনা আছে|

গবেষকরা বলছেন, ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের ২ এপ্রিল সংঘটিত এক ভূমিকম্প অনেকক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল| এই ঘটনায় চট্টগ্রামের একটি অংশের ৬০ বর্গমাইল এলাকা (সমুদ্রগর্ভে) তলিয়ে যায়| যে অংশটি তলিয়ে যায়, হিসেব করলে দেখা যাবে তা বর্তমান চট্টগ্রাম মহানগরীর আয়তনের সমান| গবেষকরা বলেন, এই ভূমিকম্পে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় ৯ ফুট এবং চেদুয়া দ্বীপ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২ ফুট পর্যন্ত উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়| বাকেরচনক এলাকার ২০০ মানুষ ও অনেক গো-মহিষাদির সলিল সমাধি ঘটে| ওই সময়টা ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন বিস্তারের সূচনাকাল| ওই জলোচ্ছ্বাস আসলে জলোচ্ছ্বাস ছিল না কি ভূকম্পনতাড়িত সুনামি ছিল এটা নিশ্চিত হওয়া এখন খুব জরুরি| আবার দেখা যায় ১৮৬৫ সালে শীতের শুরুতে এক মারাত্মক ভূমিকম্প চট্টগ্রামে সংঘটিত হয়েছিল| প্রাণহানি না হলেও ওই ভূমিকম্পের কম্পন দিনে ও রাতে ২১ বার অনুভূত হয়েছিল| ওই সময় সীতাকুণ্ড পাহাড় থেকে আগুন উদ্গীরণ হয়, পাহাড়ের অনেক স্থানে ভূগর্ভ থেকে গন্ধকের গন্ধযুক্ত উত্তপ্ত পানি, বালু ও কাদা নির্গত হয়| এখানে একটি জ্বালামুখ থাকার কথা গবেষকরা বলেন| এ ছাড়া, এধরণের অগ্নোৎপাত দীর্ঘকাল না থাকলেও নিকট অতীতে সীতাকুণ্ডের উষ্ণ প্রশ্রবণ অবলোকনের অভিজ্ঞতা অনেক পর্যটকের রয়েছে| আবার ১৮৯৭ সালে সংঘটিত আরেক ভূমিকম্প চট্টগ্রামসহ সারা ভারতবর্ষে একসাথে অনুভূত হয়েছিল| এতে বিভিন্ন ভবন বাড়িঘরে মারাত্মক ফাটল ধরার তথ্য মেলে| (তথ্যসূত্র: হাজার বছরের চট্টগ্রাম, দৈনিক আজাদী, ১৯৯৫, পৃ:১৭)

পণ্ডিত রাহুলের দেওয়া আরেকটি তথ্য তুলে ধরা দরকার যা বৃহৎ বাংলার প্রাগৈতিহাসিক জলবায়ুর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য| তথ্যটি হলো, ‘পৃথিবীর জলবায়ু সব সময় এক রকম ছিল না| এমন এক সময় ছিল, যখন বাংলার প্রান্তসীমায় আসানসোলেই বরফ পড়ত| আবার এক সময় সেখানে দেবদারুর গভীর বনও ছিল|’ (মানব সমাজ, ঢাকা, ২০১১, পৃ:৩১)

প্রাগৈতিহাসিক চট্টগ্রাম :

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পাহাড়কে ঘিরে নব্যপ্রস্তর যুগে মানুষের বসবাস ও আনাগোনার সম্ভাবনার কথা বলেন ঐতিহাসিক ও গবেষকরা| জানা যায়, ১৮৮৬ সালে সীতাকুণ্ড পাহাড়ে অশ্মীভূত কয়েকটি কাঠের কৃপাণ আবিষ্কৃত হয়| এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সময়কাল নব্য প্রস্তরযুগ বলেই প্রতীয়মান হয়েছে| ফলে চট্টগ্রামের সাথে মানুষের সম্পর্কের সময়সীমা প্রাগৈতিহাসিক কাল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে| কুমিল্লার লালমাই পাহাড়েও নব্যপ্রস্তর যুগের পাথরের কুঠার খুঁজে পাওয়ার কথা জানা যায়| আজাদীর হাজার বছরের চট্টগ্রামে গবেষকরা তাই যথার্থভাবেই মন্তব্য করেন, ‘চট্টগ্রাম, প্রাচীন ত্রিপুরা এবং গারো পাহাড় এবং তার সন্নিহিত সুবিস্তৃত মধুপুর অরণ্যের ভূতত্ত্বীয় ইতিবৃত্ত সম্ভবতঃ রচনা করেছে এক সুপ্রাচীন যুগের পটভূমি|’

অন্যান্য পণ্ডিতবর্গের মতো মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনও তাঁর ‘প্রাচীন বাঙলার রাষ্ট্র ও প্রশাসন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,  প্রাচীন এই ভূখণ্ডের জনপদ সমূহের মধ্যে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুক্ষ্ম নামের জনপদের উল্লেখ বিভিন্ন পুরান ও মহাভারতে পাওয়া যায়| খ্রিষ্টের জন্মেরও হাজার হাজার বছর আগে থেকে প্রাচীন বাংলার জনপদ-রাষ্ট্রগুলোর এইসব নাম মিলে| তখনো বাঙালি জাতিসত্তা গঠিত হওয়ার বিস্তর সময় বাকি| বাঙালি জাতিসত্তা গঠিত হয়েছে মূলতঃ খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে|  সুক্ষ্ম নামের যে জনপদের কথা এখানে বলা হয়েছে, পণ্ডিতদের অভিমত অনুসারে সেটিই প্রাগৈতিহাসিক চট্টগ্রাম অঞ্চল|

শ্রীপূর্ণচন্দ্র চৌধুরী তাঁর চট্টগ্রামের ইতিহাস গ্রন্থের প্রথম খণ্ড প্রথম ভাগে লিখেছেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভ্রমণকারী চট্টগ্রামকে বিভিন্ন নামে ডেকেছেন| তাঁর দেওয়া তালিকা অনুসারে চট্টগ্রামের ৩২টি নাম মিলে| এগুলো হচ্ছে : আদর্শদেশ, সুক্ষ্মদেশ, কীং বা কালেন, রম্যভূমি, চিতাগাঁও বা চিৎগাঁও, চট্টল, চৈত্যগ্রাম, সপ্তগ্রাম, চট্টলা, চট্টগ্রাম, চক্রশালা, চন্দ্রনাথ, চরতল, চিতাগঞ্জ, চাটীগাঁ, শ্রীচট্টল, সাতগাঁও, সীতাগঙ্গা (সীতাগাঙ্গ), সতের কাউন, পুষ্পপুর, রামেশ, কর্ণবুল, সহরেসবুজ, পার্বতী, খোর্দ-আবাদ, পোর্টো গ্রান্ডো (বড় বন্দর), ফতেয়াবাদ, আনক, রোশাং, ইসলামাবাদ, মগরাজ্য এবং ইংরেজিতে চিটাগং| শ্রী চৌধুরী আরও জানান, পাতঞ্জল সূত্রে চট্টগ্রাম আর্যবর্তেও পূর্বসীমায় আদর্শদেশ নামেই অভিহিত, এটা ছিল পৌরাণিক সুক্ষ্ম দেশের অন্তর্গত| পালিগ্রন্থে চট্টগ্রামের নাম রম্যভূমি (রম্ভূ)| তন্ত্রে এবং পুরাণে এই দেশকে চট্টল বলে| তাঁর মতে, মহাকবি নবীনচন্দ্র এই অঞ্চলকে ‘চট্টলা’ ও ‘পার্বতী’ নাম দিয়েছেন| কর্নেল উইলফোর্ডের মতে, এই দেশের নাম পুষ্পপুর, অনেকগুলো বৌদ্ধচৈত্য এখানে থাকায় এর নাম চৈত্যগ্রাম| শ্রী চৌধুরী চট্টগ্রামের পৌরাণিক ও প্রাকৃতিক বিবরণ দিতে গিয়ে আরও বলেন, ‘বর্তমান বঙ্গদেশ যখন বঙ্গোপসাগরের অতলজলে নিমজ্জিত ছিল, তখনও এই চাটগাঁর অস্তিত্ব ছিল| অতি প্রাচীনকালে কামরূপ ও রাক্ষেয়াং (বর্তমান আরাকান) রাজ্যের মধ্যবর্তী স্থানকে আর্যগণ সুক্ষ্মদেশ বলতেন| সুতরাং চট্টগ্রাম যে সুক্ষ্মদেশের অন্তর্গত তাতে অনুমাত্র সন্দেহ নাই|’ (চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংগ্রহ ও সম্পাদনা কমল চৌধুরী, ২য় সংস্করণ, ২০১৬, কোলকাতা)

স্থানীয় কিংবদন্তির উল্লেখ করতে গিয়ে ড. আহমদ শরীফ তাঁর চট্টগ্রামের ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, “মহাভারতিক যুগে কর্ণের পুত্র বিকর্ণ চট্টগ্রামে রাজত্ব করতেন| তার রাজধানী ছিল কাঞ্চন নগর| পটিয়া ও ফটিকছড়ি থানা অঞ্চলে দুটো কাঞ্চননগর আছে, সাতকানিয়া থানায় আছে ‘কাঞ্চনা’| এ তিনটেই বিকর্ণের রাজধানীর গৌরব দাবী করে| এ ছাড়া কিংবদন্তী সূত্রে আর কিছু জানা যায় না| (চট্টগ্রামের ইতিহাস, আহমদ শরীফ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১)|

আহমদ শরীফ চট্টগ্রামের আরেকটি নাম প্রসঙ্গে ‘স্টেইনগ্যাস-কমপ্রিহেনসিভ পারসিয়ান-ইংলিশ ডিকশনারি’ ঘেটে বের করলেন, ‘তিব্বতী সূত্রে চট্টগ্রামের প্রাচীন নাম পাওয়া যাচ্ছে-‘জ্বালনধারা’-তপ্তজল সমন্বিত অঞ্চল| এখানে কিছুকাল বাস করেছিলেন বলে সিন্ধুদেশীয় বৌদ্ধ সিদ্ধ বালপাদ জালন্ধরী নাম প্রাপ্ত হন| এরই অপর নাম হাড়িফা| ঝাড়ুদার হাড়ির কাজ করেছিলেন বলেই এই নাম| হয়তো অগ্নিতপ্ত জল ধারণ করে বলেই স্থানটি ‘জ্বলন্ধর’ নামে পরিচিত ছিল| সীতাকুণ্ডে ও বাড়বকুণ্ডে এখনও তপ্তজল পর্বতগাত্র থেকে নিঃসৃত হয়| এরই আরবি-ফারসি  নাম সম্ভবত ‘সামন্দর’| সাম-(অগ্নি), অন্দরে (অন্তর, -অন্দর) আছে যে স্থানে সেটিই সামন্দর| (তথ্যসূত্র : প্রাগুক্ত)|

শেষ কথা :

অশেষ চট্টগ্রামকে নিয়ে শেষ কথা নেই| বরং ভাবতেই ভাল লাগে সমগ্র বঙ্গভূমি যখন বঙ্গোপসাগরের অথৈ উত্তাল জলরাশির নিচে নিমজ্জিত ছিল, তখন এই চট্টগ্রাম এই সুক্ষ্মদেশ মাথা জাগ্রত করে ছিল| আর এই দেশের সাথে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর সুপ্রাচীনকালের এক অব্যাহত সম্পর্ক চট্টগ্রামের ইতিহাসকে দিয়েছে এক তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা ও মর্যাদা| চট্টগ্রামের সামাজিক ও ভৌগোলিক ইতিহাসের সামগ্রিক দিক ব্যাপক গবেষণার মধ্য দিয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে, এই প্রত্যাশা এখন জাগ্রত হচ্ছে| ইতিহাসে রাজা-বাদশা’র কাহিনী কখনো কখনো কারচুপির শিকার হয়| তাই ভৌগোলিক-নৃতাত্ত্বিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপকরণকে একসাথে নৈর্ব্যক্তিকভাবে ইতিহাসের স্বার্থে তুলে আনা প্রয়োজন| সুপ্রাচীন চট্টগ্রামের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধারণা ও অনুমানের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়নি| এজন্য কী করা যায় এখন থেকে আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে|

 

(লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী, গবেষক এবং কবি)