বাংলা কি কুষাণ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল
ফয়েজ আহমদ

এক সময়কার চীনের পরাজিত কুষাণ জাতি হিউংনু নামক জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে উত্তর পশ্চিম আফগানিস্তান দখল করে ও পার্থিয়ান-শকদের বিতাড়িত করে| উল্লেখ্য, প্রাচীন চীনের ইউচি সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদেরসহ পাঁচটি উপজাতীয় দলকে একত্রিত করে| বিজেতার বেশে পরবর্তীতে ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে ব্যাকটেরিয়া, পারস্য, মেসোপটেমিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে| এখানে বলে রাখা দরকার, তৎকালে পারস্য মধ্য এশিয়া থেকে গ্রিক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল| কুষাণরা তাদের রাজধানী স্থাপন করে বর্তমান পেশোয়ারে|

খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে ব্যাকট্রিয় গ্রীকদের আক্রমণে মৌর্য সাম্রাজ্যের যখন পতন হয় তখন পুরো ভারতবর্ষে রাজনৈতিক গোলোযোগ দেখা দেয় | এ সুযোগে বহিরাগত জাতি প্রথমে গ্রিক, পরবর্তী সময়ে শক-পার্থিয়ানরা অভিযান চালায় এবং পরিশেষে কুষাণদের আক্রমণ ও তাদের আধিপত্য বজায় থাকে দীর্ঘ পাঁচশ বছর| উজবেকিস্তানের ব্যাকটেরিয়া, পারস্য, মেসোপটেমিয়াসহ মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চল নিয়ে কুযুল কদফিস কুষাণ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে| ক্রমান্বয়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতবর্ষের বিশাল অংশ ওই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়|
পারস্যে সাসানীয়দের উত্থান এবং ভারতবর্ষে গুপ্ত সাম্রাজ্যের উন্মেষকালে কুষাণদের পতন ঘটে| যদিও পরবর্তী সময়ে ভারতের কিছু অঞ্চলে কুষাণ সামন্তগণ স্বাধীনভাবে শাসন করে|
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজনৈতিক গোলোযোগের কারণে ভারতবর্ষে খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় চার শতক পর্যন্ত এক জটিল মুদ্রা ব্যবস্থা চালু ছিল|
এখানে মনে রাখা দরকার, ভারত উপমহাদেশে প্রথম স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেন কুষাণ সম্রাটগণ| তাম্রমুদ্রারও প্রচলন ঘটে ব্যাপকভাবে| রুপার মুদ্রাও বাদ যায়নি| ইতিপূর্বে এমন বিচিত্র (ভ্যারাইটি) মুদ্রা আর কোনো রাজবংশ প্রচলন করেনি| ৩০ ধরনের মুদ্রা কুষাণরা চালু করে|
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ করে চীনের সাথে ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য সিল্করোডের নিয়ন্ত্রণভার কুষাণরা নেয় এবং এই রুটে ব্যবসা করার জন্য ব্যবসায়ীদের উৎসাহ প্রদান করে| ইউচি জাতি অর্থাৎ কুষাণরা চীনে বড় আকারের শক্তিশালী ও ক্ষিপ্র গতির ঘোড়া রপ্তানি করত এবং চীন থেকে সিল্ক বস্ত্র আমদানি করত| তা ছাড়া তাদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রসার ঘটেছিল রোমান সাম্রাজ্য, পারস্য সাসানীয় সাম্রাজ্য ও হুনদের সঙ্গে| ফলে বহির্বিশ্ব বাণিজ্য প্রসার লাভ করে এবং স্বর্ণমুদ্রা প্রচলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়| আর তখনই সম্রাট বীম কদফিস তা বাস্তবে রূপ দেন| তবে স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্যের লেনদেন মেটানো হত তামার মুদ্রা দিয়ে|
কুষাণরা ছিল জোরায়াষ্ট্রীয় ধর্মের| পরবর্তী সময়ে তারা বৌদ্ধ ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হয়| তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিস্তৃতি ঘটেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে| গ্রিক হেলেনিস্টিক সাম্রাজ্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে জোরায়াষ্ট্রীয় ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম মোট তিন ধর্মের স্পষ্ট স্বাক্ষর দেখা যায় বিভিন্ন মুদ্রায়| ৩০ ধরনের দেব-দেবীর প্রতিকৃতি দিয়ে তারা মুদ্রা প্রচলন করে | শুধু কনিষ্করই ২৫ ধরনের মুদ্রা পাওয়া যায়| মুদ্রার মুখ্য দিকে রাজার প্রতিকৃতি ও গৌণ দিকে গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় দেব-দেবীর প্রতিকৃতি| লিপি ছিল কিছু গ্রিক, কিছু খরোষ্টি ও কিছু ব্রাহ্মী লিপিতে| কুষাণদের মত এত বৈচিত্রপূর্ণ মুদ্রার প্রচলন আর কোনো রাজবংশে দেখা যায় না|

ইন্দো-গ্রিক থেকে সর্বপ্রথম শাসকদের প্রতিচ্ছবি বা প্রতিকৃতি দিয়ে মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়| পার্থিয়ান-শক, কুষাণ ও গুপ্তরা ক্রমান্বয়ে একই পথ অনুসরণ বা অনুকরণ করে|
কুষাণ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কুযল কদফিসের মুদ্রার মুখ্য পিঠ গোলাকার রূপার মুদ্রার বেলোনাকার বর্ডারের ভিতরে ও উত্তল প্রান্তের মধ্যে তীক্ষ্ম নাক ও গোঁফ বিশিষ্ট একটি পুরুষের সজ্জিত আবক্ষ মূর্তি এবং মাথায় ফিতা দিয়ে বাঁধানো মুকুট এবং কাঁধ পর্যন্ত ঘন লম্বা চুল দৃশ্যমান| গৌণ পিঠের ডান দিকে লাফিয়ে চলা একটি ঘোড়ার ওপর উপবিষ্ট একটি পুরুষ মূর্তি, যাকে গাউন পরিহিত ডানাযুক্ত উড়ন্ত নাইকি দেবী পিছন হতে মালা পরাচ্ছে| মুদ্রাটিতে গ্রিক অক্ষরে লিপি উৎকীর্ণ আছে|
পরমেশ্বরী লাল গুপ্তার মতে, রোম সম্রাটের মুদ্রার অনুকরণে কুযল কদফিস মুদ্রা তৈরি করে এবং এই মুদ্রায় অংকিত প্রতিকৃতিটি রোমান সম্রাট অগাস্টাসের| কিন্তু অগাস্টাসের মূর্তি পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়, উল্লেখিত মুদ্রায় অঙ্কিত প্রতিকৃতিটি অগাস্টাসের নয়| আমি (লেখক) দেখেছি নিউইয়র্কে নিউমিসমেটিক সোসাইটি অব আমেরিকায়, অগাস্টাসের মূর্তি সংরক্ষিত আছে |
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে কুষাণ আমলের বেশ কয়েকটি স্বর্ণ ও তামার মুদ্রা সংরক্ষিত আছে| সম্রাট কনিষ্ক, হুবিস্ক ও বাসুদেবের স্বর্ণ মুদ্রা প্রায় একই ধরনের| মুদ্রার মুখ্য পিঠে দণ্ডায়মান সম্রাটের প্রতিকৃতি-মাথায় টুপি| রাজার এক হাতে ত্রিশুল বা বর্ষা অন্য হাতে বেদীতে অর্ঘ্য প্রদানরত| সম্রাটের মুখে দাড়ি, লম্বা কোট ও ট্রাউজার পরিহিত| কনিষ্ক ও হুবিষ্কের গোলাকার মুদ্রার চারদিকে গ্রিক ভাষা উৎকীর্ণ আছে, যার অর্থ দাঁড়ায় রাজাধিরাজ কুষাণ কনিষ্ক ও রাজাধিরাজ কুষাণ হুবিষ্ক| বিপরীত পিঠে দেব-দেবীর ছবি| সম্রাট কনিস্ক ও বাসুদেবের বেলায় একটু ভিন্নতা দেখা যায়-কোমরে বদ্ধ তরবারি| মুখ্য পিঠে একই ধরনের লেখা রাজাধিরাজ কুষাণ বাসুদেব| বাসুদেবের মুদ্রার বিপরীত পিঠে রয়েছে শিবের বাহন নন্দী (ষাঁড়), পাশে দণ্ডায়মান শিবের প্রতিকৃতি| শিবের এক হাতে ত্রিশূল ও অন্য হাতে রাজমুকুট, মতান্তরে ফাঁস|
পেশোয়ার জাদুঘর ও দিল্লী জাদুঘর বেশ কয়েকটি তামার মুদ্রা ঢাকা জাদুঘরকে ধার হিসেবে দেয়| এ ছাড়া, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আরও বেশ কিছু তাম্র মুদ্রা সংগ্রহ করা হয়| তার মধ্যে বীম কদফিস, হুবিস্ক ও বাসুদেবের তাম্র মুদ্রা উল্লেখযোগ্য| এসব মুদ্রার মুখ্য পিঠে সম্রাটের প্রতিকৃতি, বিপরীত পিঠে দেব-দেবীর প্রতিকৃতি ও অস্পষ্ট লেখমালা, যা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ছিল এবং এতে কিছু গ্রিক লিপি অনুকরণ করতে গিয়ে ভুল লেখা হয়েছে| এতে ধরে নেওয়া হয় এই মুদ্রাগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে| গ্রিক ভাষা ও দেব-দেবী সম্পর্কে শিল্পীরা এতটা অবগত বা তত দক্ষ ছিলেন না| এগুলোকে অনুকৃতি মুদ্রা বা Imitation মুদ্রা বলা হয়| এ ছাড়া, অনুকৃতি তাম্র মুদ্রার বেশির ভাগ মূদ্রাই প্রাচীন রাঢ় বা বঙ্গ জনপদে পাওয়া গেছে| তাই এই মুদ্রাগুলোকে কুষাণ রাঢ় বা কুষাণ বঙ্গ বলে অভিহিত করেন অনেকে| এই মুদ্রাগুলোর ওজন ছিল ৩.৬৫ গ্রাম অথবা তার কাছাকাছি| কুষাণদের দুই ধরনের তাম্র মুদ্রা এই বাংলায় প্রচলিত ছিল| একটা ছিল পূর্ণাহত (Die-Struck) অন্যটা ছিল ছাঁচে ঢালা তাম্র মুদ্রা (Cast Copper Coin)
তৎকালীন বঙ্গ কুষাণ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল কি ছিল না এ প্রশ্নে ঢাকা জাদুঘরের সহকারী কিপার ড. মো. শরিফুল ইসলাম লিখেছেন, `১৯৩২ সালে মহাস্থানগড় থেকে দুটি ও রাজশাহী থেকে একটি কুষাণ স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়| সে সময় ননী গোপাল মজুমদার `Three Kushana Coins from North Bengal’ শিরোনামে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন (Vol. XXVIII -১৯৩২ পৃ. ১২৫-১৩০)| ওই প্রবন্ধে তিনি বাংলা কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, সে বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেন|
তখন বলা হয়েছিল, ২/১টি মুদ্রা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলায় আসতে পারে| যেহেতু বাংলায় কুষাণ সম্রাটদের কোনো লিপি পাওয়া যায়নি, সেহেতু বাংলা কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়নি| কুষাণ সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমা হিসেবে ধরে নেওয়া হয় পশ্চিম বিহারের শ্রীচম্প, যেখানে থেকে কণিষ্কের রাবাতক লিপি আবিষ্কৃত হয়েছে|
সুশীল কুমার বোস ১৯৩৭ সালে `Indian Culture’ জার্নালে `A Fresh Hoard of So-Called Puri-Kushana Coins’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ রচনা করেন (Vol. III পৃ. ৭২৯)| এ প্রবন্ধে পূর্ব ভারতে কুষাণ অধিকারের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, `The wave of Kushana conquest rolled far to the east of Mathura and Banaras and did not stop before it swept Bihar and Bengal’| অর্থাৎ তিনি বাংলায় কুষাণ অধিকারের কথা জোর দিয়ে বলেছেন|
এরপর অদ্রিজ ব্যানার্জি Numismatic Society of India -এর জার্নালে ‘Numismatic Evidence of Kushana Marunda Rule in Eastern India’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন (Vol. XIII, পৃ. ১০৭-০৯)| এ প্রবন্ধে তিনি বিহার, উড়িষ্যা ও বাংলায় প্রাপ্ত কুষাণ স্বর্ণমুদ্রা, কয়েকটি খরোষ্টিলিপি এবং কুষাণ Art Motif পোড়ামাটির ফলকের ভিত্তিতে জোর দিয়ে বলেছেন যে, বাংলা কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল| এরপর সরযুগ প্রসাদ সিং Numismatic Society of India এর জার্নালে ‘Numismatic Evidence of Kushana Marunda Rule in Eastern India’ শিরোনামে আরেকটি প্রবন্ধ রচনা করেন (ভল্যুম.৩৫, পৃ. ২৩৭-৪১)| এ প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিহার ও উড়িষ্যায় কুষাণ অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন| কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে তিনি কুষাণ অধিকারের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন|
১৯৫৩ সালে পি. এল. গুপ্ত Indian Historical Quarterly জার্ণালে Eastern Expansion of the Kushan Empiress শিরোনামে আরেকটি মৌলিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেন (ভল্যুম ২৯, ১৯৫৩, পৃ-২০৫-২১)| এ প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন যে, বাংলায় কুষাণ শাসন প্রমাণ করতে হলে, এখানে কুষাণদের তাম্রমুদ্রা পেতে হবে| কারণ তাম্রমুদ্রা হলো কুষাণ সাম্রাজ্যের Local Currency, যেখানে তাম্রমুদ্রা পাওয়া যাবে, সেখানেই কুষাণ শাসন বিস্তৃত হয়েছিল বলে মনে করতে হবে| অন্যদিকে স্বর্ণমুদ্রা বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো| তিনি যখন প্রবন্ধটি রচনা করেন, তখন তামলুক থেকে একটি তাম্রমুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল| এ ক্ষেত্রে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, তাম্রলিপ্তি একটি প্রাচীন আন্তর্জাতিক বন্দর| সেখানে একটি তাম্রমুদ্রা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে আসতে পারে| এটি প্রমাণ করে না যে, বাংলায় কুষাণ শাসন ছিলো| অন্যদিকে বাংলায় দু-একটি কুষাণ স্বর্ণমুদ্রা প্রাপ্তি তিনি মনে করেন ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে এ মুদ্রা এসেছে|
কুষাণ যুগের বাংলা নিয়ে সবচেয়ে ভালো গবেষণা করেছেন বি.এন মুখার্জি| তিনি ১৯৯০ সালে Indian Museum Buletin- G ÓKharosti and Kharosti Brahmi Inscriptions in West Bengal” শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন| তাঁর মতে, বাংলায় কুষাণ শাসনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে খারোষ্টি লিপি| কুষাণদের মাধ্যমে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে খারোষ্টি লিপি বিস্তার ঘটেছে| বাংলায় যদি খরোষ্টি লিপি পাওয়া যায়, তাহলে মনে করতে হবে এখানে কুষাণদের শাসন ছিল| তিনি চন্দুকেতুগড়, বেড়াচাঁপা, দেগঙ্গা, পাণ্ডুরাজার ঢিবি, হরিণারায়পুরও তামলুকে প্রাপ্ত ৭৭টি পোড়ামাটির সীল মৃৎপাত্রে খরোষ্টিলিপি আছে বলে উল্লেখ করেছেন| এসব সীল পাঠোদ্ধার করে তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কুষাণযুগে ভারতের উত্তর পশ্চিম অঞ্চল থেকে বহু লোক ব্যবসা-বাণিজ্য ও উর্বর কৃষিভূমির সন্ধানে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করে| তারা পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ঘোড়া ও চালের কারবার করতো| এই ব্যবসায়ী শ্রেণি পরবর্তীকালে এদেশে রাজ্য গড়ে তোলে এবং কুষাণদের সামন্তে পরিণত হয়| তারাই ছিল বাংলায় কুষাণ সংস্কৃতির বাহক| অর্থাৎ তিনি পরোক্ষভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, বাংলায় কুষাণদের অবস্থান ছিল| তবে তাঁর মতে, বাংলায় কুষাণদের শাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্য শুধু চন্দ্রকেতুগড় বা প্রাচীন বঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল|
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত অপ্রকাশিত কুষাণ মুদ্রা শীর্ষক সেমিনারে (মার্চ ১০, ২০১৫) বিভিন্ন পণ্ডিতবর্গ নিম্নলিখিত মতামত ব্যক্ত করেন :
প্রফেসর ড. শরিফ উদ্দিন বলেন, রাজনীতি ও ধর্মের যে আতাঁত ছিল মুদ্রার বিপরীত পিঠে সেটা আরো খতিয়ে দেখতে হবে| কুষাণরা আসছে বাংলা পর্যন্ত, বাংলা হয়তো তখন সামন্ত ছিল, কুষাণদের দ্বারা পদানত|
আমরা জানি কুষাণ শাসন পরবর্তীতে বৈন্যগুপ্ত সর্বপ্রথম এ অঞ্চলে স্বাধীন রাজা ছিলেন|
প্রফেসর ড. এনামুল হক মন্তব্য করেন, আব্বাসীয় আমলের খলিফা মুনতাসির বিল্লার মুদ্রা পাওয়া যায় ময়নামতির খননের ফলে, তাই বলে বলা যাবে না আব্বাসীয়দের অধীন ছিল এই বাংলা| শুধু মুদ্রা প্রাপ্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না যে, কুষাণ সাম্রাজ্যের অধীনে বাংলাদেশ ছিল| তবে এ দেশ কুষাণদের বাণিজ্যিক বলয় ছিল|
কুষাণদের অণুকৃতি (Imitation) মুদ্রা যেগুলো বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল সেগুলো ব্যবসায়ীরা এদেশে তাদের বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য নিজেরাই তৈরি করে|
প্রফেসর ড. আব্দুল মোমিন চৌধুরী বলেন, এ অঞ্চলে কুষাণ সাম্রাজ্য ক্ষমতায় থাকুক আর নাই থাকুক, কুষাণদের Economic Zone ছিল এ বাংলাদেশ|
মুদ্রায় ব্রাহ্মী ও খরোষ্টিলিপির ব্যবহার এবং চন্দ্রকেতুগড়, মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রাপ্ত সীলগুলোতে খরোষ্টিলিপির ব্যবহারে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় বাংলা কুষাণ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল|
তবে বাংলাদেশ কুষাণদের দ্বারা শাসিত ছিল কিনা বা কুষাণ সাম্রাজ্যের অধীন ছিল কি ছিল না এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে আরও গবেষণার দরকার|
তথ্য সূত্র :
১| প্রাচীন মুদ্রা : শ্রী রাখাল দাস বন্দোপধ্যায়
২| KUSHANA SILVER COINAGE tB.N. MUKHERJEE
৩| বাংলা পিডিয়া : বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
৪| COINS & CURRENCY SYSTEMS OF EARLY BANGALtB.N. MUKHERJEE
৫| বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত অপ্রকাশিত কুষাণ মুদ্রা : ড. মো. শরিফুল ইসলাম
৬| Bound less world History-I “Expansion & Decline of the Kushan Empire”
৭| সিল্করোডের গৌরবময় প্রত্নসম্পদঃ নাজিম উদ্দিন আহম্মদ
৮| COINS OF ANCIENT INDIA VOL. 1–BY VINCENT A. SMITH
৯| COINS : PARMESHWARI LAL GUPTA
১০| প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য – বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
(লেখক : প্রত্নতত্ত্ব গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা)