হোম » বাংলাদেশে কৃষির আদি স্বপ্নদ্রষ্টা আনোয়ারার এএসএম কামালউদ্দিন

বাংলাদেশে কৃষির আদি স্বপ্নদ্রষ্টা আনোয়ারার এএসএম কামালউদ্দিন

এ বি এম জিয়াউদ্দিন

এ বি এম জিয়াউদ্দিন

বাংলাদেশে খ্যাতিমান ও ক্ষণজন্মা ব্যক্তিদের একজন প্রখ্যাত কৃষিবিদ এগ্রোনোমিস্ট সুগারকেইন স্পেশালিস্ট এবং হর্টিকালচারিস্ট এএসএম কামালউদ্দিন|

কামাল উদ্দিনের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান| নানা প্রতিকূলতার মাঝে প্রায় আট মাইল হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করতেন তিনি| ১৯৩৭ সালে আনোয়ারা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন| তারপর যথাক্রমে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এগ্রিকালচার বিভাগে বিএসসি পাস করে ভর্তি হন (বিএজি) বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল, ইনস্টিটিউটে| অধ্যক্ষ ছিলেন উইলিয়াম মরিসন ক্লার্ক| উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে|

এএসএম কামালউদ্দিন

এএসএম কামালউদ্দিন বিএজি পাস করেই গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকায়| ১৯৪৪ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ মাস কাজ করেন রংপুরে| ১৯৪৭ সালের ২৫ আগস্ট বোটানিস্ট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ইস্ট বেঙ্গল (পরে ইস্ট পাকিস্তান) এগ্রিকালচার কলেজে| দেশ ভাগের কারণে হিন্দু প্রফেসর থেকে শুরু করে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ পদ খালি পড়েছিল| ড. হেদায়েত উল্লাহ, ড. ওসমান গনিসহ— হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক, গবেষক, গুটি কয়েক রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, কয়েকজন ওভারসিয়ার এবং ফিল্ডম্যান আগলে রেখেছিলেন কলেজটিকে|

কামাল উদ্দিন ঢাকায় এসে শিক্ষকতা এবং গবেষণার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন| অল্পদিনের মধ্যে ছাত্র ও সহকর্মীদের মধ্যে তিনি বোটানিস্ট কামাল সাহেব হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন| বোটানি শিখতে গিয়ে তাঁর কাছে ছাত্ররা এগ্রোনমির বহু কিছু শেখে| স্বাধীনতাউত্তর দেশে বইপত্র ও তেমন ছিল না| শিক্ষক হিসেবে কামাল সাহেবের কাছে চাইলে বইও পাওয়া যেত| অনেক দুর্লভ বই তাঁর সংগ্রহে ছিল| এর মধ্যে তিনি নয়াদিল্লীতে Indian Agricultural Research Institute এ কিছুকাল শষ্যমড়ক-এর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং এই সুযোগে ও কিছু ভাল বইও সংগ্রহ করেছিলেন|

তাঁর সব কর্মকাণ্ড, গবেষণা ও ফলাফল এ  স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়| তাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে তুলে ধরছি|

এক সময় মনে করা হতো মুন্সিগঞ্জের রামপালের অমৃত সাগরকলা আর কোথাও হবে না| কিন্তু অধ্যক্ষ ড. হেদায়েত উল্লাহর বরাদ্দ দেওয়া পাঁচটি মিউজিয়াম প্লটে অমৃত সাগর কলার বাগান করে কামালউদ্দিন প্রমাণ করলেন—এই কলার ফলন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশের) যে কোন জায়গায় হবে| তিনি ক্লাসের সময় ছাড়া বাদ বাকি সময় ছাত্রদের নিয়ে গবেষণা প্লটে কাটিয়ে দিতেন| তাঁর গবেষণালব্ধ সাগরকলা বিদেশেও রপ্তানি হয়েছিল|

Gient Kew কবি আনারস (অসম) তেজপুরে খুব ভাল হতো| কামাল উদ্দিন সেই আনারসের চারা সংগ্রহ ও রোপন করে দেখালেন আমাদের এখানেও এর ভাল উৎপাদন সম্ভব| পার্বত্য চট্টগ্রামে ও দেশের অন্যান্য স্থানে এই আনারস এত ব্যাপকভাবে উৎপাদন হয়েছিল যে, তা দেখে অনেকে মন্তব্য করেছেন—কামাল সাহেব… ‘কামাল করে দিয়েছেন|’ একইভাবে দেখিয়েছিলেন ঢাকা কৃষি ফার্মে পানের বরোজ করা কিংবা টবেও পান ফলানো সম্ভব| হলুদের উচ্চ ফলনশীল যে জাতটি বাংলাদেশে জনপ্রিয়, সেটির উদ্ভাবকও তিনি| আদা, কাকরী ও শিংনাথ বেগুনের ভাল জাত সন্ধান, প্রবৃদ্ধিকরণ এবং সেই সাথে বিভিন্ন জাতের তরিতরকারি চাষের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করার ব্যাপারে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রাখেন|

কামাল উদ্দিনের দেশ চিন্তা ছিল অত্যন্ত গভীর; ক্ষুদ্র চাষীর উপকার কিভাবে হবে সেই লক্ষ্যে তিনি কাজ করেছেন সবসময়| যে পাঁচটি মিউজিয়াম প্লট তাঁকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তার দুএকটিতে তিনি সারা বছর আখের ব্রিডিং নিয়ে গবেষণা করতেন| আখের উন্নত জাত ভারত ও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হতো| আখের ওপর তাঁর গবেষণার সাফল্য লক্ষ্য করে বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য ১৯৫২ সালে সরকার তাঁকে Trueman Point Four Program -এ আমেরিকার হাওয়াই রাজ্যের ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টারে পাঠান| তিনি ডিগ্রি অসমাপ্ত রেখে পাঁচ মাস পরে দেশে ফিরে আসেন| ফলে কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হন| ফিরে আসার কারণটি খুব স্পষ্ট নয়| তিনি সতীর্থদের বলতেন, ওখানকার খাবার তাঁর সহ্য হতো না| নিকট আত্মীয়দের পীড়াপীড়িতে বলতেন ‘যেগুলি আমার জানার দরকার ছিল তা আমি এই পাঁচ মাসে দিন-রাত পড়াশোনা করে জেনে নিয়েছি| তারপর প্রশিক্ষণ কর্তৃপক্ষকে বললাম, বাকী যা পড়ানো হচ্ছে বা শিখবার সিলেবাস দেওয়া হচ্ছে সেগুলি আমার জানা| সেই মোতাবেক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির হয়ে ইন্টারভিউ দিলাম এবং তারপরে ওরা আমাকে রিলিজ দিল|’ সেই অল্প সময়ে তিনি যা শিখতে পেরেছিলেন তা দিয়ে সত্তরের দশকে দেশের আখ এবং চিনি উৎপাদনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন| পরবর্তী সময়ে রপ্তানিতে দেশ যে গৌরব অর্জন করেছিল, তার অনেকখানি কামাল উদ্দিনের প্রয়াসে সম্ভব হয়েছিল| — বলেছেন জনাব এম. মাহবুবুজ্জামান, প্রাক্তন কেবিনেট সচিব|

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আখের প্রথম সফল প্রজনন হয় কামাল উদ্দিনের হাতে| ISD2/54 আখের জাতটি তাঁর গবেষণার ফসল| হাওয়াইয়ান প্রজনন পদ্ধতির অনুসরণে এই জাতটির উদ্ভাবন হয়| প্রায় ৬০ বছর আগে উদ্ভাবিত এই জাতটি পরবর্তীকালে উদ্ভাবিত উন্নত জাতগুলির সঙ্গে আজও বেঁচে আছে| উত্তরবঙ্গের কিছু আখ অঞ্চলে এই জাতটির এখনও চাষ করা হয়| এই জাতটি রোগ সহিষ্ণু এবং এটি চাষে সেচের প্রয়োজন হয় না| এই সাফল্যের সুবাদে কামালউদ্দিনকে সুগার কেইন স্পেশালিস্টের পদ মর্যাদা দেয়া হয়েছিল|

১৯৫৪ সালে কামাল উদ্দিনকে সুগারকেইন বোটানিস্ট হিসেবে বদলি করা হয় ঈশ্বরদী ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রে| ২৩৫ একরের এই কেন্দ্রটি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থে স্থাপিত হওয়ায় প্রায় সময় কেন্দ্র থেকে টাকা আসতো দেরিতে বা অনিয়মিত| এতে তো কেন্দ্রের খরচ বহনে সমস্যা হতো| ষাটের দশকের শুরুতে কেন্দ্রটি প্রাদেশিক সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়| এই সময় কেন্দ্রটি দারুণ অর্থ সঙ্কটে পড়ে| এই সঙ্কট মোকাবেলার জন্য ফার্মের নিচু অংশে ধান চাষ করা হতো| ধান বিক্রি টাকা সংরক্ষিত হতো আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলার জন্য| তহবিল সঙ্কটের কারণে মাসের পর মাস কর্মকর্তারা বেতন পেতেন না|

পরপর তিন বছর সরকারি মজুুরি আসা বন্ধ ছিল| এ অবস্থায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল আজম খান, কোনো এক ছুটির দিনে অনির্ধারিত সফরে এসে হঠাৎ ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রে উপস্থিত হন| কামাল সাহেব তখন গেঞ্জি গায়ে, লুঙ্গি পরে নিজের সবজি বাগান তদারকি করছিলেন| গভর্নর খোঁজ-খবর নেওয়ার পর তাঁকে প্রশ্ন করলেন, আখ গবেষণা কেন্দ্রে ধানের চাষ কেন হচ্ছে? একটু থেমে বললেন, ‘I shall sack you.’’ কামাল উদ্দিনের জবাব ছিল এরকম, ‘মহাশয়, আপনি কি জানেন এই কেন্দ্রে গত তিন বছর যাবৎ মজুরির অর্থ পাচ্ছে না? কেন্দ্রের কোনো ত্রুটি কর্তৃপক্ষ দর্শাননি, কেন্দ্র বন্ধের নোটিশও পাইনি| অথচ আমরা এই কেন্দ্রে টিকে আছি, কর্মচারীদের বেতন চালিয়ে যাচ্ছি, কর্মকর্তারা বিনা বেতনে কাজ করেছি| স্যার আপনি কি বলবেন, আমাদের আর কতদিন এভাবে অপেক্ষা করতে হবে?’

গভর্নরের সুর নরম হলো—‘এটাই কি বাস্তব?’ Please give me your telephone, let me ring up.’   সাথে সাথে টেলিফোনে নির্দেশ পাঠিয়ে তিনি বললেন ‘Now you work I will come again.’সামরিক সরকারের সর্বোচ্চ কর্তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রকৃত অবস্থা মর্মস্পর্শী করে তুলে ধরার দৃষ্টান্ত বিরল| কেন্দ্র ত্যাগ করার পূর্বে গভর্নর কামাল উদ্দিনের কিচেন গার্ডেন দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন| তাই পরবর্তীতে গভর্ণর তাঁকে ডেকে নিয়ে ঢাকায় কিচেন গার্ডেন প্রজেক্ট পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন| আজম খান কামালের নাম সুপারিশ করেছিলেন ‘তগমায়ে কায়েদে আজম’ (TAQ)পদকের জন্য, যেটা তিনি পেয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে, আখের নতুন জাত উদ্ভাবনের কৃতি হিসেবে| অবশ্য এই খেতাব তিনি ১৯৭১ সালে বর্জন করেন| অস্ট্রেলিয়ান সুগার ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট বিশেষজ্ঞ মি. এলান পিটার স্মিথ একটি সংবর্ধনা সভায় উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন- Mr. Kamal is the father of Sugar Industry of Bangladesh.১৯৬৬ সালের ১১ এপ্রিল ইপিএডিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এ কে এম আহসান কামাল উদ্দিনকে চিফ হর্টিকালচারিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেন| কামাল যোগ দেওয়ার পর গ্রিন বেল্ট প্রকল্পের আওতায় চারটি বিভাগে চারটি বড় কৃষি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য রাঙামাটিতে বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প স্থাপনের কাজ হাতে নেন| পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (EPADC)ছয় বছর কার্যকালে তিনি উদ্যান বিজ্ঞানকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে নিয়ে আসেন| দেশে অনেকগুলি ‘হর্টিকালচার ফার্ম’ স্থাপিত হয়| নতুন প্রতিষ্ঠিত কৃষি এস্টেটগুলিতে হর্টিকালচার কর্মসূচি ব্যাপকভাবে চালু হয়| সারা দেশে নার্সারির বিস্তার হয়| কৃষি কলেজগুলিতে ডিগ্রি শ্রেণিতে উদ্যান বিজ্ঞান পাঠ্যসূচিতে স্থান পায়| বহু মালিকে গুটি কলম, জোর কলম, চোখ কলম, টি বাডিং করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো হাতে-কলমে| পরবর্তী সময়ে এই প্রশিক্ষিত মালিরা নিজেরাই নার্সারি ব্যবসায় প্রভূত উন্নতি সাধন করেন| বাংলাদেশে চাষিরা ধান-পাট ও রবি শষ্য ফলনের মধ্যে সীমিত ছিল| সবজি ফল-মূল-এর চাষ করে অল্প খরচে বাড়তি আয় করা সম্ভব, এটা ভাববার অবকাশ ছিল না অধিকাংশ চাষির| আজ বাজারে আনারস, কমলা, কলা, মধু, পেয়ারা, বিচিহীন লেবু বিপুল পরিমাণে দেখা যায়, যা সম্ভব হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের বদৌলতে যার পরিচালক ছিলেন কামাল উদ্দিন|

১৯৬৭ সালে কামাল উদ্দিন জরুরি ভিত্তিতে ১৫ দিনের জন্য দুই জন উদ্যানবিদকে উন্নতজাতের আম চাষের ওপর প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুরে পাঠিয়ে ভিনিয়ার গ্রাফটিং পদ্ধতি ও সাইড গ্রাফটিং পদ্ধতি শেখার ব্যবস্থা করেন| এই প্রশিক্ষণের ফল হিসেবে অল্পদিনে উত্তরবঙ্গের আম চাষের ক্ষেত্রে বেশ ভালো পরিবর্তন আসে| এরকম বহু সাফল্য তাঁর রয়েছে| ইপিএ ডিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এ কে এম আহসানের (প্রাক্তন CSP) ভাষায়— ‘এ এস এম কামালউদ্দিন ছিলেন লিভিং অথরিটি অন হর্টিকালচার’|

১৯৭২ সালে ২৪ মে কামাল উদ্দিন বাংলাদেশ চিনি সংস্থার ডাইরেক্টর, কেইন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ পদে যোগ দিয়ে তাড়াতাড়ি আখ উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টায় নেমে পড়েন| চাষীরা যাতে উন্নত জাতের আখ বীজ পায় তার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন|

এ ছাড়া তিনি তাঁর বাছাই করা ছাত্রদের এই সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসেন| তাদেরকে অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট, উপযুক্ত প্রমোশন দেয়ার ব্যবস্থা নেন| ফলে দেখা গেল তাঁর ছাত্র তাঁর থেকে বেশি বেতন পাচ্ছেন| তাঁর তিন বছরের চেষ্টায় এই শিল্পে উৎপাদন বেড়ে গিয়ে চিনি রপ্তানিতে বাংলাদেশের যোগ্যতা অর্জিত হয়েছিল| সেটা আজ ইতিহাস|

তাঁর সততা ও নিষ্ঠা ছিল প্রশ্নাতীত, অসততা তাঁকে নিদারুণ কষ্ট দিত| প্রাক্তন ক্যাবিনেট সচিব এম মাহবুবুজ্জামান এক জায়গায় লিখেছেন— ‘কামালউদ্দিন একজন  অত্যন্ত উঁচুমানের শিক্ষক, অসামান্য পড়ুয়া, তীক্ষ্ম মেধা ও স্মৃতির অধিকারী, অকল্পনীয়-রকম উপকারী, অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং অনন্য ব্যক্তিত্ব|… কামাল সাহেবের জ্ঞান ও মেধা ছিল ডিগ্রি জয়ী| ডিগ্রির অভাবে কামাল সাহেবের কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি| তাঁর পাণ্ডিত্য এবং দক্ষতা তাঁকে সাফল্যে পৌঁছে দিয়েছে| ড. এম শাহজাহান এক প্রবন্ধে লিখেছেন— ‘আমাদের দেশে ডিগ্রি এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশি ডিগ্রি সুবিধা আদায়ের মাধ্যম মাত্র| বিদ্যা কাজে লাগানোর ইচ্ছাকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পায় স্বার্থচিন্তা…|’

কৃষি গবেষণা-ট্রায়াল এবং প্রশিক্ষণের অভাব পূরণের জন্য ১৯৭৫ সালে CERDI (Central Extension Resource Development Institute) প্রতিষ্ঠিত হয়| এই ‘সার্ডি’তে তিনি (কামাল উদ্দিন) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নির্বাচিত হন (১৯৭৬-১৯৭৭)| ১৯৮০ সালে চিনি ও খাদ্য শিল্প থেকে অবসরে গিয়ে রুটস প্লান্টেশন কোম্পানির পরামর্শকের দায়িত্বে ছিলেন (১৯৮১-১৯৮৩)| এই পদে তিনি দুই বছর তিন মাস শেষে IFAD  এ কো-অর্ডিনেটিং কনসালটেন্ট নিযুক্ত হন|

সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কামালউদ্দিন ‘ধানমণ্ডি’ নার্সারি শুরু করে নিজ ভ্রাতুষ্পুত্র আবু তাহেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিচালনা করতে দেন| প্রতিদিন একটা বিশেষ সময়ে তিনি প্ল্যান্ট ডাক্তার হিসেবে সেখানে বসতেন| গাছের সমস্যা শুনে প্রেসক্রিপশন দিতেন মাত্র দু টাকা ফি নিয়ে| এই ধানমণ্ডি নার্সারিতে ৩০০ জাতের গোলাপ চারা কলম ˆতরি করে বিক্রির ব্যবস্থা নেন এবং এই সময় গোলাপ চাষের ওপরে বাংলা বই লিখেন| অবশ্য এর আগে সবজির চাষ, ফলের চাষ, আমের চাষ ইত্যাদি বই লিখে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন| নার্সারি ব্যবসায় তিনিই প্রথম উচ্চশিক্ষিত কৃষিবিদ| তাঁর ভাতিজা তাহেরকে ভারতে পাঠিয়েছিলেন গোলাপের Cut flower -এর বাণিজ্যিক চাষ দেখে আসার জন্য| তাহের ভারত থেকে ফিরে এলে তিনি প্রথমে পাঁচ হাজার চারা লাগান| পরবর্তীতে এই সংখ্যা ২০ হাজারে দাঁড়ায়| অন্যদিকে, একই সময়ে গ্রীন রোডে United Seedstore খুলে তাহেরকে কিভাবে বীজ পরীক্ষা করে বপন করতে হবে ইত্যাদি বুঝিয়ে শিখিয়ে দেন| বর্তমানে আবু তাহের বাংলাদেশের নামি-দামি বীজ বিক্রেতাদের প্রথম তিন জনের মধ্যে এক জন| ১৯৯৫ সালে FAO Sponsored tour -এ আবু তাহের শ্রীলংকা, ফিলিপিন ও পাকিস্তান সফর করেন|

১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে কামালউদ্দিন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট চত্বরে ৩৫ শতাংশ জমির ওপরে তাঁর কৃষিবিদ নার্সারি শুরু করেন| এই নার্সারিতে চাকরিরতদের—মাটি তৈরি করা, সার ব্যবহার করা, আধুনিক পদ্ধতিতে কলম করা, গাছের রোগ চিনে নেওয়া, পাতা দেখে ফুলের রং চেনা ইত্যাদি তিনি খুব নিয়ম করে শিখিয়েছিলেন| তিনি নিজে এই নার্সারিতে মালি প্রশিক্ষণের ১৫ দিনের কোর্স শুরু করেছিলেন| তিনি মনে করতেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি প্রযুক্তি পৌঁছে দিলে একজন ভালো মালি একটা এলাকাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে|

কামাল উদ্দিন বিভিন্ন সময়ে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন| কিন্তু তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পদক প্রদানের লক্ষ্যে কৃষিবিদদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়| ১৯২১ সালের ১ মার্চ কামাল উদ্দিন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা খাসখামা গ্রামের মৌলবি বাড়ির খন্দকার বংশে জন্মগ্রহণ করেন| পিতা নজমুদ্দিন কাজমী| মাতা আমিনা খাতুন| কামাল উদ্দিন এই ফুলে-ফলে ভরা জগত রেখে ১৯৯৯ সালের ২২ নভেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান|

সূত্র : স্মৃতিতে কৃষিবিদ কামালউদ্দিন, সম্পাদনা — আতিকা বতুল খানম

লেখক : সমাজ উন্নয়নকর্মী|