হোম » রাণী এলিজাবেথের চট্টগ্রাম সফর : কিছু স্মৃতি কথা

রাণী এলিজাবেথের চট্টগ্রাম সফর : কিছু স্মৃতি কথা

মাহমুদ এ চৌধুরী আরজু

মাহমুদ এ চৌধুরী আরজু

নানা কারণে বৃটেনের রাণীর ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের বিশেষ করে চট্টগ্রামের অনেক মানুষের আগ্রহ রয়েছে, অনেকের রয়েছে নিজস্ব স্মৃতি কিংবা পূর্বসূরীদের কাছ থেকে শোনা গল্প ও ছবি|

বৃটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ

আমারও রয়েছে বাবার কাছ থেকে শোনা এবং বাবার সঙ্গে রাণীর ছবি নিয়ে কিছু স্মৃতি কথা| ছোটকালে বড়দের কাছে শুনতাম, একযে ছিল রাজা, আর এক ছিল রাণী-এ রকম রাজা-রাণীর কিসসা কাহিনী। ১৯৬১ সালে আমার বয়স মাত্র দেড়-দুবছর| অনেক কিছুই বোঝার সময় হয়নি তখন| তবে ঘরের দেয়ালে টানানো বাবার সঙ্গে হাত মেলানো এক সুন্দরী মহিলা আর সঙ্গের অচেনা মানুষগুলো দেখে ভাবতাম এরা কারা? কোন দেশি মানুষ আমাদের ঘরের দেয়ালে সযত্নে শোভা পাচ্ছে!

১৯৬১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এর আগমন উপলক্ষে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন| ছবিতে বাদশাহ মিয়া চৌধুরীকে রাণী এলিজাবেথের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যাচ্ছে

আর একটু বড় হয়ে বাড়ল কৌতুহল| বাবা-মা বড় ভাইদের কাছে জানলাম ছবির সুন্দরী নারীটি হচ্ছে বৃটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের| পাশের দীর্ঘদেহী সুদর্শন পুরুষটি তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ| ১৯৬১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এক রাজকীয় সফরে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) এসেছিলেন রাজকীয় বিমানে করে| তাঁর রাজকীয় বিমানটি নেমেছিল ঢাকার পুরোনো বিমান বন্দরে| সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ| বিমান বন্দরে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান তৎকালীন গভর্ণর আজম খান| রমনা পার্কের কাছে একটি পুরোনো-ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে উঠেছিলেন রাণী, যেটি পরবর্তী সময়ে রূপান্তরিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন-সুগন্ধায়| ভবনটি বর্তমানে পরিচিত ফরেন সার্ভিস একাডেমি হিসেবে| রাণীর থাকার জন্য বাড়িটিকে মনোরমভাবে সাজানো হয়েছিল| রাণী ঢাকার বিভিন্ন দর্শনীয় ও বাণিজ্যিক স্থান ঘুরে ঘুরে দেখেন| তিনি ঢাকার বাইরে পৃথিবীর বৃহত্তর জুটমিল -আদমজী জুটমিল’ পরিদর্শন করেন| পরদিন চট্টগ্রাম সফরে আসেন রাণী ও তাঁর স্বামী| চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে রাণীকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অনেক গণমান্য ব্যক্তির সঙ্গে আমার বাবা বাদশা মিয়া চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন| অন্যদের সঙ্গে তিনিও রাণীর সঙ্গে করমর্দনের মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন| বিমান বন্দর থেকে রাণী ও তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ মোটর শোভাযাত্রা সহকারে আসেন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বর্তমানে জিয়া যাদুঘর)| সার্কিট হাউসে আসার পথে চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ তাঁদের হাত নেড়ে ও ফুল ছিটিয়ে শুভেচ্ছা জানান|

রাণী ও মি. ফিলিপ একটি খোলা মোটর কারে আসার সময় হাত নেড়ে জনতার শুভেচ্ছার জবাব দেন| যতটুকু জেনেছি, রাণীকে বহনকারী ওপেল গাড়িটি ছিল বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, রেফারি ইসলাম নামে খ্যাত ইসলাম মিয়ার| বিকেলে সার্কিট হাউসের সামনে রাণীর সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়| এতে বক্তৃতা করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর আজম খান, চট্টগ্রাম পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ও আর নিজাম| সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাণীকে একটি কারুকাজ করা তলোয়ার উপহার দেন তৎকালীন এমএলএ ফরিদ আহমদ চৌধুরী| অনুষ্ঠানে অন্যদের মাঝে আমার বাবা বাদশা মিয়া চৌধুরী, অধ্যক্ষ আজমত উল্ল্যাহ, অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, মৌলানা নূরুল হক চৌধুরী, ইসলাম মিয়া, আমার মেঝো ভাই এ এ কামাল চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন| সংবর্ধনার জবাবে রাণী তাঁর বক্তব্যে চট্টগ্রামবাসীর আতিথেয়তার প্রশংসা করেন|

সার্কিট হাউসের সামনে রাণীর সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনায় উপস্থিত জনতা

জানা যায়, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ সরকার তৈরি করেছিল রাজস্ব ও ফৌজদারি বিষয়ক আপিল শুনানীর জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনারদের জন্য| কালক্রমে এটি অতিথিশালায় রূপান্তরিত হয়| রাণী এলিজাবেথের আগমন উপলক্ষে সার্কিট হাউসের শৌচাগার আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সংস্কার করা হয়েছিল| এতে ব্যয় হয়েছিল সে আমলের প্রায় ১০ হাজার টাকা|

২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদীর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, চট্টগ্রাম সফরে এসে রাণী এখানকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখেন এবং সার্কিট হাউসে সংবর্ধনায় যোগ দেন| সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাণী বলেন, Ôচট্টগ্রামে আসার পর থেকে আপনাদের আতিথ্য আমার স্বামী ও আমার হৃদয় ছুঁয়েছে| বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন গত অক্টোবর (১৯৬০) মাসে বয়ে যাওয়া দুর্যোগের (ঘূর্ণিঝড়) ক্ষত এখনো রয়ে গেছে আপনাদের মনে| সরকারি ও বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য যা কিছু করতে পেরেছি তাতে আমি আনন্দিত|Õ

তৎকালীন চট্টগ্রাম পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ও.আর.নিজাম রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাগরিক সংবর্ধনায় ভাষণ দেন

 

উল্লেখ্য, রাণী এলিজাবেথ ১৯৮৩ সালের ১৪ নভেম্বর একবার ৪ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন| বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা) পরিবেশিত খবরে জানতে পারি, রাজকীয় সফরের সময় রাণী চট্টগ্রামের একটি মডেল গ্রাম ও গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগী চালায় যাওয়ার জন্য ট্রেনে ভ্রমণ করেছিলেন| চট্টগ্রামে তিনি চাল থেকে কীভাবে মুড়ি তৈরি করা হয় তা দেখছিলেন| চট্টগ্রামে কিছু শিল্প কারখানাও পরিদর্শন করেন রাণী|

১৯৬১ সালে রাণীর চট্টগ্রাম তথা পূর্ববাংলা সফরের সময় তাঁর সিংহাসনে আরোহনের আট বছর পেরিয়েছিল| ১৯৫৩ সালে রাজা ৬ষ্ঠ জজের মৃত্যুর পর তাঁর মেয়ে দ্বিতীয় এলিজাবেথ বৃটেনের রাণী হন| দীর্ঘ ৭০ বছর তিনি বৃটেনের রাণী ছিলেন| এছাড়াও তিনি ছিলেন কমনওয়েলথভুক্ত ৫২টি দেশের প্রধান|

বৃটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদে বার্ধক্যজনিত রোগে মারা গেছেন| তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর| তাঁর মৃত্যুতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছিলেন| সরকার রাণীর মৃত্যুতে ৯-১১ সেপ্টেম্বর তিনদিনব্যাপী বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে| প্রসঙ্গত, রাণী এলিজাবেথ ও তাঁর স্বামীর চট্টগ্রাম সফরকালীন আমার বাবার সঙ্গে রাণীর শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবিটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখনো আমার বাসায় যত্ন-সহকারে রেখে দিয়েছি|

তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে আমিও শোকাহত হয়েছি| আমি জ্ঞান অর্জনের জন্য কয়েকবার বিলেত গিয়েছি| গিয়েছি লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসে| ভবিষ্যতেও যাওয়ার আশা রয়েছে| তবে যখন যাবো তখন লন্ডন শহর আর রাণীর শহর থাকবে না| ওই শহর হবে রাজা তৃতীয় চার্লস এর|

লেখক : শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ