দৌলত-উল-আলমের স্মৃতিরেখায় পটিয়া

আমার জন্ম ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পাঁচ কি ছয় তারিখ। আজ আমি আমার জীবনের কিছু কথা লিখছি। আমার স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল।
আমার জন্ম চট্টগ্রাম শহরের কর্ণফুলী নদীর ওপারে পটিয়ায়। সেখান যেতে হলে নৌকা-সাম্পান করে ফেরিঘাট পার হতে হয়। তাছাড়া কর্ণফুলীর উপর বিস্তৃত কালুর ঘাট ব্রিজের উপর দিয়েও পটিয়া যাওয়া যায়। শুনেছি বহু আগে এসব জায়গা নাকি জলদস্যুদের আখড়া ছিল। কর্ণফুলীর ওপারে গিয়ে দস্যুরা লুটের মাল ভাগ করত। তারা বলত ‘পাততোয়া’ অর্থাৎ ভাগ কর। এটা পর্তুগীজ ভাষা। আমাদের ভাষায় পর্তুগীজ অনেক শব্দ চলে এসেছে। তারা বাসন (থালা)কে বলত ‘বর্তন’! চট্টগ্রামের কোনো কোনো অঞ্চলে এখনও ‘বর্তন’ কথাটা প্রচলিত আছে।
অনেক আগের কথা। আসামের লুসাই পাহাড় থেকে অবিরল ধারায় নেমে আসছে কর্ণফুলী নদী। নিচে নেমে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিশে সে হল খুব খরস্রোতা। তাই প্রাচীনকাল থেকেই চট্টগ্রাম ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় সামুদ্রিক বন্দর এবং সুরাট, মাদ্রাজ, বোম্বের বিদেশী বেনিয়াদের একচেটিয়া বাণিজ্য কেন্দ্র।
কথিত আছে প্রাচীনকালে এক চাকমা সুন্দরীর সাথে এক বিদেশি সওদাগরের মন দেয়া-নেয়া হয়। এভাবে যখন বিদেশি সওদাগরকে মেয়েটি মনের গহীনে ভালোবেসে ফেলে তখন একদিন ঐ বিদেশি বাণিজ্য-সওদা নিয়ে নিজ দেশে পাড়ি জমায়। তাকে ফিরে পাওয়ার আশায় চাকমা সুন্দরী অধীর হয়ে পড়ে। তখন ভিনদেশী প্রেমিক তাকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য একজোড়া কানফুল দেয়। কানফুল কানে দিয়ে সুন্দরী দীর্ঘদিন তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। প্রেমিকের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একদিন সে নদীতে গেল গোসল করতে। হঠাৎ সে দেখে তার একটা কানে কানফুল নেই। তাদের শাস্ত্রের অভিমত— কানফুল হারানো একটা অশুভ লক্ষণ। তাই সে অধীর আগ্রহে আবার নদীতে নেমে পড়ল কানফুল খোঁজার জন্য। কিন্তু খরস্রোতা কর্ণফুলী তাকে চিরদিনের জন্য বুকে টেনে নিল। তার আর কানফুল পরে বিদেশী প্রেমিকের সাথে ঘর করা হল না। শোকে দুঃখে সেদিন থেকে নদীর নাম দিল সবাই কর্ণফুলী।
আমার বাবা ছিলেন পটিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার। আমরা যে জায়গায় থাকতাম তার নাম ছিল ‘তালতইল্যা চই’ (তালতলা চৌকি)। চৌকির অনতিদূরে গোবিন্দরখিল গ্রাম। দুইয়ের মাঝখানে ‘বঅনপাড়া’ অর্থাৎ ব্রাহ্মণপাড়া। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় ব্রাহ্মণকে ‘বঅন’ বলা হয়। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যোজন যোজন মাইল জুড়ে বিস্তৃত ধূলার রাজপথ চলে গেছে। পাশে বিরাট পুকুর। পুকুরের পাড় জুড়ে রাশি রাশি চোখ জুড়ানো সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটে থাকত। পুকুরের ঘাট মেয়েদের গোসলের জন্য চিকন বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল। পুকুরে কচুরিপানা, ফুল ভেসে থাকত। আমি একেবারে শিশু, অনেক সময় বেড়ার ফাঁকে হাত গলিয়ে ফুল ছিঁড়তে গিয়ে ঝুপ করে পানিতে পড়ে যেতাম। কিন্তু ডুবতাম না। সেই কচুরিপনা ও ফুলের ওপরেই ভেসে থাকতাম। আমার কান্না শুনে কেউ না কেউ এসে আমাকে টেনে তুলত।
পুকুরের ওপারে সবুজ গালিচার ন্যায় সমান্তরাল পাড়। সেখানে আমার মায়ের ক্ষেত-খামার। তার পরে বিভিন্ন বড়-মাঝারি আকারের আম, জাম, লিচু আর সুপারি গাছ। আর ছিল কেতকী ফুলের ঝাড়। বৃক্ষরাজিতে জায়গাটা ঘন সবুজ হয়ে থাকত। সেই অরণ্য ভেদ করে কিছুই দেখা যেত না। এই বনটা পার হলে পড়শীদের ঘর-সাধারণ খেটে খাওয়া, নিরন্ন, সর্বহারা মানুষের সংসার। তাদেরই একজন মধ্যবয়সী মহিলা আমাদের বাড়িতে দিনে-রাতে কাজ করত। আমার মা-বাবার বিরাট একান্নবর্তী সংসার। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ছাড়াও আমরা পরপর অনেকগুলো ভাইবোন। পড়শীদের অনেকেই আমার মায়ের টুকটাক ফাই-ফরমায়েশের কাজ করত।
তালতলা চৌকি বিরাট মহল্লা। চৌমুহনী থেকে সরকারি একটা রাস্তা চলে গেছে রেল লাইনের দিকে (গোবিন্দারখিল আমিরভাণ্ডার দরবারের দিকে) আর একটা গেছে জজকোর্টে (পটিয়া যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত)। একটা সরকারি অফিস-আদালতের দিকে (সম্ভবত বর্তমান তালতলা চৌকি থেকে আবদুর রহমান বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ঘেঁষে মুন্সেফবাজার হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের দিকে) আর অন্যটা গেছে পদ্মপুকুরের দিকে (তালতলা চৌকি থেকে উত্তর দিকে ভূর্ষি-কেলিশহর সড়কে প্রায় ২০০ গজ গেলেই সড়কের পশ্চিম পাশে পদ্ম পুকুর-বর্তমানে অনেকটা ভরাট)। জায়গাটা চতুর্দিকে যেন মায়াজাল বিস্তার করে আছে। আমাদের এলাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সারা দিনমান জনসমাবেশ জন কোলাহল লেগে থাকত। সন্ধ্যা হলে লাল রক্তিম আভা ছড়িয়ে সূর্য পাটে বসত। ধীরে ধীরে রাত নেমে আসত। খাওয়া-দাওয়ার পর মা আমাদের বিছানায় শুইয়ে দিতেন। মায়াবিনী কুহকিনী রাত। মা যেন ঘুমন্তপুরীর মায়া-কাঠির ছোঁয়ায় আমাদের ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। এ এক যাদুর কাঠি। আমরা লাইন ধরে এক কাতারে বিশাল বিছানায় ঘুমাতাম। তন্দ্রার ঘোরে এপাশ ওপাশ করলে আবেশ জড়ানো চোখে শুধু মাকেই দেখতাম। আমার সুধাময়ী মায়ের তুলনা হয় না। সারা পৃথিবী যেন একসময় ঘুমন্তপুরী হয়ে উঠত। মধ্যরাতে ঢেঁকিঘরে কে যেন ধুপ….ধুপ করে বিরাট এক কাঠের ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে। তার লবঙ্গলতার মত দেহ হেলে দুলে একবার এপাশ, আরেকবার ওপাশ হচ্ছে। তার আলতাপরা রক্তরঞ্জিত পা। ঢেঁকিতে পা রেখে রূপসী পাড় দিচ্ছে ধুপ…ধুপ…ধুপ…ধুপ। প্রতিরাতে আমার ঘুম ভেঙে যেতে। সারা দিনের শোনা গল্পগুলি যেন চোখের উপর মূর্ত হয়ে উঠত। রাত শেষে একটা অদ্ভুত কালো কাক ডেকে উঠত কা….আ….কা….আ….করে। ভয়ে আমরা একে অন্যের গায়ে আরো ঘেঁষে শুতাম। সবাই বলতো এটা নাকি ‘ভূত কাউয়্যা’ মানে ‘ভূত কাক’। চট্টগ্রামের ভাষায় বলে ‘ঢোল কাউয়্যা’। ওটা একটানা ডেকেই যেত। রাতে কাক ডাকলে অশুভ লক্ষণ।
সকাল বেলায় মা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন কাজের লোকদের নিয়ে সকলের জন্য নাস্তা তৈরি করতে। প্রতিদিন ভোর হলে আমাদের পেছনের আঙ্গিনায় নারী-শিশুর ভিড় জমতো। তারা বলত-‘অ খালা, ভূত-কাউয়্যা সারারাত ডেকেছিল, লক্ষণ ভাল না।’ তারা বলত আসলে ওটা একটা জ্যান্ত ভুত; সারাদিন ঝোপে-ঝাড়ে, গাছে লুকিয়ে থাকে। রাত হলে কাক সেজে ডাকতে থাকে। ওরা আরও বলত, পরীরা নাকি শেষরাতে ঢেঁকিতে পাড় দেয়। আর পাড় দেওয়া বন্ধ হলে ভুত কাক তখন অশুভ ডাক ডাকতে থাকে।
আমি পরীর গল্প, ভূত কাকের গল্প শুনে শুনে পরীকেও বিশ্বাস করতাম আর কাককেও ভুত বলে বিশ্বাস করতাম। ঢেঁকিতে পরীর পাড় দেওয়ার ধুপ ধুপ শব্দ আর ভূতের কা…কা….শব্দ গভীর রাতে আমার চোখের ঘুম কেড়ে নিত। গা ছম্ছম্ করে উঠত।
একদিন ঠিক দুপুরবেলা পুকুরের ওপাড়ে সবাই দেখল একটা বড় কালো কাক মুখ থুবড়ে মরে পড়ে আছে। দু’জন মহিলা দু’দিকে তার ডানা দুটো ধরে মা’র কাছে নিয়ে এলো দেখাতে। হাসতে হাসতে মাকে বলল ‘খালা, ভুত কাউয়্যা মরে গেছে’। তারপর তাকে নিয়ে পুকুর পাড়ে কবর দিল।
আমাদের পড়শীর ছেলে-মেয়েরা সারাদিন পুকুরে সাঁতরে বেড়াত। পুকুরধারের সেই সবুজ গালিচার মত চৌকোনা জায়গাতে মা মৌসুমি ক্ষেত করেছেন। মা একটু ইশারা করলেই কেউ না কেউ এসে মাকে সাহায্য করত। মা’র রান্নার আর নাস্তার জুড়ি মেলা ভার। পিঠা তৈরির জন্য ছিল মার আলাদা ঢেঁকি ঘর। পিঠা তৈরির জন্য পাড়ার বউ-ঝিরা এসে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চাল কুটে গুঁড়ো করে দিতো।
এছাড়া মা’র একশ’টা হাঁস আর একশ’টা মুরগি ছিল। আচার বানাতেও মা ছিলেন দক্ষ। মা’র হাতে যেন যাদু ছিল। যে কোনো বীজ পুঁতে দিলেই কয়েকদিনের মধ্যে চারা হয়ে তা দলেবলে চেড়ে ফলভারে নুয়ে পড়ত; সারা মৌসুমে খেয়েও শেষ হতো না। ভূত কাউয়্যার মত আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় এক বৃদ্ধা মারা যায়। বৃদ্ধাকে সবাই ডাকত হাইব্ব্যার দাদী (ছপ্পা বুর শ্বাশুরী) বলে। (হাইব্ব্যা-তার নাম হয়ত হাবীব ছিল)। পাড়ার মেয়েরাই এসে নানা গল্প বলত। আমরা শুনতাম হাইব্ব্যার দাদীর মৃত্যুর পর জ্যোৎস্নাপ্লাবিত চাঁদনি রাতে ঠিকরে পড়া চাঁদের আলোয় সবাই নাকি তার কবরের উপর কিসের ছায়া দেখেছে।
এরকমই সব অদ্ভুত বিশ্বাসে ভরা ছিল আমার শৈশবকাল।
(সূত্র : দৌলত-উল-আলমের গ্রন্থ: স্মৃতির বালুকাবেলায়)