আবদুল মালুম এবং তাঁর পরিবারের সমাজকর্ম
ইতিহাসের খসড়া প্রতিবেদন

আবদুল মালুমের পুরো নাম শেখ আবদুল আলি, মালুম তাঁর পেশাগত উপাধি| উনবিংশ শতাব্দীর চট্টগ্রাম শহরে তিনি ছিলেন ব্যস্ত ব্যবসায়ী, জাহাজ মালিক, জমিদার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সমাজকর্মী| তাঁর বংশধরেরাও বৃহত্তর হালিশহর-পতেঙ্গা এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজের নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন এবং সমাজকর্মে নেতৃত্ব দিয়েছেন| পরিবারে সংরক্ষিত চিঠিপত্রসহ বিভিন্ন দলিলের অনুলিপি, বয়স্কজনের স্মৃতি এবং স্থানীয় ইতিহাসের সূত্র অবলম্বনে আবদুল মালুম ও তাঁর বংশধরদের সমাজকর্মের নানা দিক ইতিহাসের খসড়ার কাছে তুলে ধরেছেন ড. শামসুল হোসাইন|
বিশ্বে টিকে থাকা প্রাচীন সব বন্দরের একটি চট্টগ্রাম| ইতিহাসের নানা পর্যায়ে সভ্যতার বিকাশে সমুদ্র-পরিবহণ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে| জাহাজ পরিচালনায় আধুনিক কলা-কৌশল আবিষ্কারের আগে অনন্ত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দূর-দূরান্তে অর্থনৈতিক সংযোগ সৃষ্টি করা সত্যিকার অর্থেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ কঠিন কাজ| কোনো রকম অ্যাকাডেমিক প্রশিক্ষণ ছাড়া কেবল সমুদ্রে নেমে হাতে-কলমে অর্জিত অভিজ্ঞতার পূঁজিতে অদম্য সাহসিরাই সাগর-মহাসাগরে চলার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারতেন| চট্টগ্রামের মালুম-সারাং-সুকানিরা এ-কেতার মানুষ| আবদুল মালুম তাঁদের একজন| রমজান আলি তাঁর পিতা| দাদার নাম বকশ আলি| রমজান আলির পরিবার পরবর্তী সময়ে হালিশহরে বসতভিটা স্থাপন করে| এর আগে মধ্যযুগের বন্দর এলাকা সুলকবহরে সম্ভবত ছিল তাঁদের বাড়ি|
১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল আবদুল মালুমকে একখানা প্রশংসাপত্র প্রদান করেন| এর তারিখ ও বিষয়বস্তু সমীক্ষায় দলিলটির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়| ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি, সোমবার, বিলেতের মহারানি ভিক্টোরিয়াকে ‘ভারত সম্রাজ্ঞী’ ঘোষণার জন্য দিল্লিতে একটি রাজকীয় দরবার অনুষ্ঠিত হয়| ভারতের সকল রাজা-মহারাজাসহ জনসাধারণকে কোম্পানি শাসন থেকে রাজকীয় শাসনে পরিবর্তনের বিষয়টি অবহিত করার জন্য এই দরবারে মাদ্রাজ ও বোম্বের গভর্নরবৃন্দ; পাঞ্জাব, বাংলা ও উত্তর-পশ্চিম প্রদেশসমূহের সকল লেফটেন্যান্ট গভর্নর; প্রধান সেনাপতি; দিল্লিতে উপস্থিত সপারিষদ ক্ষমতাসীন প্রধানগণ এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা যোগদান করেন| অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের পর্তুগিজ উপনিবেশসমূহের গভর্নর জেনারেল, খেলাতের খান, মস&কটের সুলতানের প্রতিনিধি, শ্যাম (বর্তমান থাইল্যান্ড) ও নেপালের রাজদূত, কাশগরের আমিরের দূত, বিদেশি সরকারসমূহের কনস্যুলার অধিকর্তাবৃন্দ এবং সাম্রাজ্যের নানা অঞ্চল থেকে আমন্ত্রিত সম্ভ্রান্ত অথিতিগণ| সিংহাসনে আসীন হন ভাইসরয়| চিফ হেরাল্ড ঘোষণা পাঠ করেন|
মহারানি ভিক্টোরিয়ার ভারত সম্রাজ্ঞী পদবি গ্রহণ উপলক্ষে ওই দিনের ‘গেজেট অব ইন্ডিয়া’-য় ভাইসরয় প্রদত্ত অনেক সম্মাননার তালিকা প্রকাশিত হয়| ‘রায় বাহাদুর’ খেতাব লাভ করেন চট্টগ্রামের বাবু গোলক চন্দ্র চৌধুরী| সম্ভবত একই উপলক্ষে এই তারিখেই ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেলের আদেশে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল আবদুল মালুমের সমাজসেবার স্বীকৃতি জানিয়ে সদ্য ঘোষিত ‘ভারত-সম্রাজ্ঞী’ ভিক্টোরিয়ার পক্ষে একখানা প্রশংসাপত্র জারি করেছিলেন|
প্রশংসাপত্রে আবদুল মালুমের জনকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতি স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও লোকশ্রুতিতে স্থান পায় ভিন্ন প্রসঙ্গ : হালিশহর-পতেঙ্গার সৈকত-সংলগ্ন ‘কাক চর, বক চর, “হইয়েদে” (হয়েছে) চর, “হইবদে” (হবে) চর-সহ সকল জমি মহারানি ভিক্টোরিয়ার সনদ মূলে আবদুল মালুমের সম্পত্তি| প্রশংসাপত্রটি লোকমূখে ‘সনদ’ হিসেবে উল্লেখিত হয় এবং জমি-জমা অর্জনের বিষয় প্রাধান্য পায়| প্রকৃতপক্ষে এই প্রশংসাপত্র জারির আট বছরেরও অধিক পরে ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই হালিশহরের চরাঞ্চলে ১৭৮৫ বিঘা (৫৯০ একর) জমি অস্থায়ী কিন্তু নবায়নযোগ্য তালুকি চুক্তিতে সরকার আবদুল মালুমকে প্রদান করে| মূলত মালুম ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও সরের জাহাজের মালিক| স্থানীয় ইতিহাসে তাঁর পাঁচখানা জাহাজের নাম জানা যায়: ১. জেবুন্নিসা, ২. আম্মাজান, ৩. সেকান্দর, ৪. মওলা বকশ ও ৫. ভদ্রকালী| ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় মালুমের অপর জাহাজ ‘ফতুহুল বারি’ নিত্যানন্দ কুণ্ডদের মালিকানায় গিয়েছিল বলে পারিবারিক জনশ্রুতি আছে|
১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট বাংলা সরকারের বিচার বিভাগ হাজি আবদুল মালুমকে চট্টগ্রাম সদর বেঞ্চে সংশ্লিষ্ট অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটও নিযুক্ত করেছিলেন| নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ‘কলকাতা গেজেটে’ প্রকাশিত হয় বলে নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা হয়| চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ডি. আর. লায়ালের ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মে লিখিত পত্রে আরও জানা যায়, পোর্ট কমিশনারস অ্যাক্ট ১৮৮৭ অনুযায়ী আবদুল মালুম পোর্ট ট্রাস্টের সদস্য নির্বাচনে একজন সম্মানিত নির্বাচক ছিলেন| কোলকাতা থেকে বাংলা সরকারের ভারপ্রাপ্ত কনিষ্ঠ সচিব (১৮৭৯ থেকে ১৮৮০ চট্টগ্রামের কালেক্টর এবং ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকালে মেমোরান্ডাম অব দ্য রেভেন্যু হিস্ট্রি অব চিটাগং রচনা করেন) এইচ. জে. এস. কটনের ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারকে লিখিত পত্রে তৎকালীন বন্দর এলাকার উন্নয়নে আবদুল মালুমের অবদানের উল্লেখ আছে| এই পত্রে তৎকালীন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মহেষখালি হয়ে হালিশহর গ্রাম পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণের অর্ধেক খরচ আবদুল মালুম বহন করেছিলেন বলে জানা যায়| তৎকালীন মহেষখালীর মুখে কর্ণফুলি নদীতে ছিল আবদুল মালুমের জাহাজের স্থায়ী পোতাশ্রয়| সেসময় বন্দর থানার পশ্চিম পাশ দিয়ে আদি মহেষখালের সংযোগ ছিল কর্ণফুলির সঙ্গে| আবদুল মালুমের পোতাশ্রয়ের সামান্য উজানে উপনিবেশিক আমলে আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিষ্ঠা লাভ করলে জায়গাটি মহেষখালীর বদলে ডবলমুরিং নামে খ্যাত হয়, কিন্তু পোস্ট অফিসের নাম বহুকাল মহেষখালীই থেকে যায়|
২৮ অক্টোবর ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে সম্পাদিত একখানা উইলে উল্লেখ আছে, আবদুল মালুম ৩ (তিন) খানা মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন| নিজ জমি-জমা পুত্র আলি মিঞা সাবরেজিস্ট্রারকে উইল মোতাবেক অর্পণকালে এই দলিলের ১ নম্বর অনুচ্ছেদের শর্ত : ‘হুজুর রাজস্ব আদায়পূর্বক বাকী মুনাফা হইতে আমার প্রভৃতি ৩ খানা মসজিদ, ঐ মসজিদের ময়জুম [মুয়াজ্জিন] খতিপ [খতিব] ও চেরাগ ও মেরামত ইত্যাদী দিবা [দিয়ে] মসজিদ চালাইবেক|’ মালুমের তিন মসজিদের একটি নিজ বাড়ির আঙ্গিনায়, একটি উত্তর হালিশহরে বড় পোলসংলগ্ন এবং অপরটি হাটহাজারির খন্দকিয়া গ্রামে বলে জানা যায়| প্রত্যেক মসজিদের সঙ্গে অজু-গোসলের ব্যবস্থার জন্য পুকুর খনন করা হয়| নিজ বাড়ি থেকে কিছু দূরে উত্তর-পূর্বে জনকল্যাণে একটি দিঘিও খনন করেছিলেন তিনি ও তাঁর ভাইয়েরা| এই জলাশয় ‘কুমারীর দিঘি’ নামে পরিচিত|
বিভিন্ন দলিলের সূত্রে প্রমাণিত হয় যে, আবদুল মালুম ও তাঁর পরিবার অত্যন্ত রাজভক্ত ছিলেন| বিনিময়ে ইংরেজ রাজপুরুষেরাও আবদুল মালুম ও তাঁর পরিবারের প্রতি সহৃদয়তা পোষণ করতো| ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনে এইচ ই আই সি-র ৩৪ পদাতিক বাহিনীর সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে| শহরে বসবাসরত ইউরোপীয়রা তখন ভয় পেয়ে কর্ণফুলি নদীতে নোঙরকৃত সরের জাহাজে আশ্রয় নিয়ে গভীর সমুদ্রে পালিয়ে যায়, জাহাজের মালিক ছিলেন আবদুল মালুম| বিদ্রোহকালে ইউরোপীয়রা কী রকম জীবন সংশয় বোধ করেছিলেন তার একটি নিদর্শন চট্টগ্রাম শহরের নূর আহমদ সড়কের সঙ্গে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সড়কের সংযোগস্থল থেকে কিছু পশ্চিমে টিলার ওপর ক্রাইস্ট চার্চের চিতানো কাঁচের (স্টেইন্ড গ্লাস) জানালার তলায় উৎকীর্ণ লেখ|
আবদুল মালুমের বৃদ্ধাবস্থায় কলের জাহাজের প্রচলন হলে সরের জাহাজের ব্যবসা মার খেতে শুরু করে| ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার লায়ালকে লেখা লেফটেন্যান্ট গভর্নরের একান্ত সচিব ই. জি. কলভিনের একখানা আধা সরকারি পত্রে সিপাহি বিদ্রোহকালে সহায়তার জন্য আবদুল মালুমকে রাজনৈতিক পারিতোষিক প্রদানের বিষয় আলোচিত হয়েছে| বৃদ্ধাবস্থায় তিনি আর্থিক অসচ্ছলতায় নিপতিত হয়েছিলেন| আবদুল মালুমের ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ার ব্যাপারটি আরও জানা যায় তাঁর সম্পাদিত উইল থেকে| উইলের ৬ নম্বর পরিচ্ছেদে পুত্র আলি মিঞাকে ‘বিত্তাদী … হস্তান্তর করিয়া আমার কর্জ্জ শোধ করীবেক’ বলে তাগিদ দেওয়া হয়েছে| মালুমের নাতি আবু তাহের জানালেন, তাঁর দাদা ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন|
আবদুল মালুমের ছেলে আলি মিঞা সাবরেজিস্ট্রারও ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন সজ্জন ব্যক্তি| ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জনের চট্টগ্রাম আগমনকালে কর্নফুলি তীরের মহেশখালি এলাকা (ইন ফ্রন্ট অব পিটিশনারস& স্যান্ড ফোর-শোর) থেকে ৩১ বার কামান দাগিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল আলি মিঞাকে| মালুম-বাড়ি থেকে সামান্য উত্তরে তিনি নতুন বাড়ি নির্মাণ করেন ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে| ১৯৫৩ পর্যন্ত এই বাড়িতে প্রজাদের খাজনা আদায়ে বার্ষিক পুন্যাহ অনুষ্ঠিত হতো|
সাবরেজিস্ট্রারের ছেলেরাও সমাজোন্নয়নমূলক কাজে সজাগ ছিলেন| বড় ছেলে আবু জাফর মিঞা এলাকার বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে প্রথম এম. ই. (মিডল ইংরেজি) স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে এবং দীর্ঘকাল এই স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন| ছোট ছেলে আবুল বশর মিঞা ছিলেন সম্পাদক| তাঁদের ঐকান্তিক চেষ্টায় এই শিক্ষালয় ১৯৫৭-তে হাই স্কুলে উন্নীত হলে তা উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্য মন্ত্রী আতাউর রহমান খান| আবু জাফর মিঞা বিভিন্ন সময়ে বৃহত্তর হালিশহর ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য, সহ-সভাপতি ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন| নিজে মুসলিম লিগের কাউন্সিলর হওয়া এবং ক্ষমতায় গেলে যুক্তফ্রন্টের জমিদারি বিলুপ্তির ঘোষণা সত্ত্বেও ১৯৫৪-র সাধারণ নির্বাচনে তিনি ফ্রন্ট প্রার্থী মাহমুদুন নবী চৌধুরীকে সমর্থন দেন| আবু জাফর মিঞা ছিলেন চট্টগ্রাম আদালতের একজন জুরি|
প্রজাবৎসল জমিদার হিসেবে জাফর মিঞা ও তাঁর ভাইয়েরা মিলে সমুদ্র সৈকতের সন্নিকটে একটি ঈদগা স্থাপন করেছিলেন এবং জমিদারি উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে খাল ও দিঘি খননে মনোযোগ দিয়েছিলেন| কয়েক মাইল দীর্ঘ খালটি বর্তমানে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনসহ এলাকাবাসীর কাজে লাগছে| আবুল কাসেম মিঞার দিঘির পাড়ে স্থাপিত হয়েছে ইনভেস্টরস ক্লাব| খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলামকে ‘দরিয়ায়ে নুর’ নামে একটি ‘ভেকেশন হাউজ’ নির্মাণের জন্য নিজের খামারসংলগ্ন জমি বন্দোবস্তি দিয়ে আবু জাফর মিঞা তৎকালের হালিশহর-পতেঙ্গা সৈকত অঞ্চলে একটি অনন্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন সৃষ্টিতে সহায়তা করেন| তাঁদের খামারের বার্মা-সেগুনে তৈরি বাংলোগুলোও ছিল দৃষ্টিনন্দন| সাগর তীরের ধুধু বালুচরে অনেক অর্থ ও শ্রম ব্যয়ে আবু জাফর মিঞা ও তাঁর ভাইয়েরা চারটি বড় বড় খামার বাড়ি গড়ে তুলে এবং সামর্থবান প্রজাদের জমি বন্দোবস্তি দিয়ে এলাকার উন্নয়ন সাধন করায় বর্তমানে সেখানে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন স্থাপন সম্ভব এবং লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে|
১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে উপনিবেশিক শাসনকালে বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে ‘কমিটি ফর দি স্যানিটারি ইমপ্রুভমেন্ট অব দ্য টাউন অব চিটাগং’ গঠনের মাধ্যমে নগরায়নের আধুনিক ধারণা প্রথম বিকশিত হয় চট্টগ্রামে| শহরের কোনো মুসলিম নাগরিকের নাম পাওয়া যায় না এই কমিটিতে| পরের বছর সিপাহি বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে শহরের ইউরোপীয় পরিবারগুলো আত্মরক্ষা করে আবদুল মালুমের জাহাজে সমুদ্রে পালিয়ে| ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন বন্দর থেকে স্বগ্রাম হালিশহর পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণে অর্ধেক খরচ যোগান দিয়ে আবদুল মালুম বন্দর এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, যার মূল পরিসরটি এখনও প্রায় অবিকৃত অবস্থায় জনস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে| একাধিক মসজিদ নির্মাণ, ঈদগা প্রতিষ্ঠা, স্কুল স্থাপনে উদ্যোগ, নৌকা-সাম্পান চলাচলের উপযোগী সুদীর্ঘ ও প্রশস্ত খাল কেটে প্রজাদের কৃষি কাজে ও মাছ উৎপাদনে সহায়তা, বাগানবাড়িসহ চারটি বড় আকারের খামার প্রতিষ্ঠা, ‘দরিয়ায়ে নুর’ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা, পুকুর-দিঘি খনন করে আবদুল মালুম ও তাঁর বংশধরেরা বন্দর শহর চট্টগ্রামে সমাজকর্মের দীর্ঘকালীন পারিবারিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেন|
ড. শামসুল হোসাইন-মালুম বংশের উত্তরসূরী, ইতিহাস গবেষক, প্রাক্তন কিউরেটর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যাদুঘর