হোম » অমর বিপ্লবী সুহাসিনী

অমর বিপ্লবী সুহাসিনী

হোসনে আরা কামালী

হোসনে আরা কামালী

শুধু সমকালেই নয়, মহাকালকেও কাঁপিয়ে দেন যাঁরা, তাঁরা যুগস্রষ্টা| কর্ম, জ্ঞান, দূরদৃষ্টি, ধৈর্য এবং তার সঙ্গে আজীবন সংগ্রাম জড়িয়ে থাকে তাঁদের জীবনের পরতে পরতে| আর তিনি যদি হন মাতৃরূপা, ক্ষমাশীলা এবং মানবপ্রেমী তাহলেতো ইতিহাস আছড়ে পড়ে তাঁর পায়ের কাছে| সুহাসিনী দাস (১৯১৫-২০০৯) তেমনি একজন নারী| অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেও ইতিহাসে অসাধারণ জীবনবীজ রোপন করে তিনি অমর মানবী| ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যাতাকলে শোষিত দেশমাতৃকার জন্য তিনি হয়েছিলেন সর্বত্যাগী দেশমাতার সেবক| ১৯৪০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবসের শ্রীহট্ট মহিলা সংঘের সভায় তিনি যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন দেশসেবা ও নিজের জীবনাচরণের—তা সে সময়েতো বটেই পরবর্তী সময়ে এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও একজন ত্যাগী ও দেশপ্রেমী হিসেবে সুহাসিনী দাসকে পরিচিত করেছে| আজীবন খদ্দেরকাপড় পরিধান করে তিনি গরিব উৎপাদনকারীকে অনুপ্রেরণা ও সাহায্য করার মানসিকতা পোষণ করতেন| কর্মে ও ত্যাগে এবং জীবনাচরণে সুহাসিনী দাস গৃহীমানবসেবী অথচ সন্ন্যাসিনীর জীবনযাপনকেই বেছে  নিয়েছিলেন|

সুহাসিনী দাস

বিপ্লবী সুহাসিনী দাসের জন্ম ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ, বাংলা ১৩২২, ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে| সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর তাঁর নিজ গ্রাম| তাঁর বাবার নাম প্যারীমোহন রায় (আনুঃ ১৮৬৮-১৯৬৮), মা শোভারায় (আনুঃ ১৯০২-১৯৭১)| সুহাসিনী তাঁদের প্রথম সন্তান| ধনাঢ্য পরিবারে অত্যন্ত আদরের বড় হওয়া সন্তান সুহাসিনী| ভাটি বাংলার আত্মজা সুহাসিনীর বেড়ে ওঠা নানা লোকবিশ্বাস লোকাচারকে সঙ্গে নিয়ে| জন্মের পর তাঁর ঠিকুজীতে অমঙ্গলের আশঙ্কা থাকায় তাঁর ষষ্টী দিবসও পালন হয়েছিল| এসময়ে আরও ছিল ভূত-প্রেত, গুনিন, নানা অপদেবতা ইত্যাদির প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস| সুহাসিনীর গ্রামটি সে সময়ও প্রচলিত অর্থে গণ্ডগ্রাম ছিল না| ভৌগলিকভাবে গ্রামটি বর্তমান জেলা শহর সুনামগঞ্জের নয়, সিলেট জেলার কাছাকাছি| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তিক্তস্মৃতি সে সময়ে শিশু সুহাসিনীর শিশুমনে রেখাপাত করেছিল—নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল-এটা তিনি লিখে গিয়েছেন তাঁর স্মৃতিগ্রন্থ সেকালের সিলেট গ্রন্থটিতে|

শিক্ষাজীবন

সিলেটে নারীশিক্ষার বুনিয়াদ তৈরি হয় ১৮৭৬ সালের দিকে শ্রীহট্ট সম্মেলনীর চেষ্টায়| এ নারীশিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচির বালাই ছিল না| মৌলিক শিক্ষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই পুরস্কার পাওয়া যেত| সিলেটে নারীশিক্ষার উদ্বোধন ও প্রসারে এবং নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য| পরবর্তীকালে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে মধ্যবিত্ত বাঙালিদের অংশগ্রহণ নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা বিষয়টি সামনে চলে আসে| ব্রাহ্মসমাজের রাজচন্দ্র চৌধুরী বিশ শতকের শুরুর দিকে সিলেট শহরে প্রথম বালিকাবিদ্যালয় (১৯০৩) স্থাপন করেন| ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরুর পর বাংলার প্রতিটি জনপদে জাতীয়বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, তার একটি পরোক্ষ প্রভাব অন্যান্য স্থানের মতো জগন্নাথপুরের নিস্তরঙ্গ জনপদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও বিস্তার করে| কমরেড বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২) ভারতবর্ষের মধ্যে প্রথম ১৮৮০ সালে সিলেটে জাতীয়বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন| এ শিক্ষাপ্রচেষ্টায় মেয়েদের ব্যাপক অংশগ্রহণে বহুসংখ্যক বিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়| তবে ক্ষেত্রবিশেষে জাতীয়বিদ্যালয় মেয়েদের শিক্ষা, অক্ষরজ্ঞান, দস্তখত বা পাঁচালীপাঠ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল| জগন্নাথপুর গ্রামে জাতীয়বিদ্যালয় স্থাপনের সভাটি হয়েছিল সুহাসিনীর  বাবার বাড়িতে| বিশিষ্ট কংগ্রেসনেতা ও পাইলগাঁওয়ের জমিদার ব্রজেন্দ্রনারায়ন চৌধুরী (১৮৮২-১৯৭২) ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন| জগন্নাথপুরে জাতীয়বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য কাজ করেন ভারত রায়, খগেন রায়, বিপিন চৌধুরী, হৃদয় চৌধুরী এবং সুহাসিনীর বাবা প্যারীমোহন রায়| স্কুলটির যাত্রা শুরু হয় বিপিন চৌধুরীর বাড়িতে| সুহাসিনীর বয়স যখন ছয় বছর| তখন তিনি জগন্নাথপুরের বিদ্ব্যোৎসাহী দুই ভাই বিপিন চৌধুরী ও হৃদয় চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত একমাত্র মেয়েদের পাঠশালায় যেতে শুরু করেন| সেটা ছিল ১৯২১ সালের ঘটনা| বিপিন চৌধুরীর স্ত্রী সুশীলাদেবী ওই পাঠশালায় পড়াতেন| তিনি শিলং থেকে গুরু ট্রেনিং নিয়ে এসেছিলেন| সুশীলা দেবীই সুশাসিনী রায় থেকে স্কুলে ভর্তির সময় নাম রাখেন সুহাসিনী| এই বিদ্যালয়ে চতুর্থমান পর্যন্ত লেখাপড়া করেন সুহাসিনী| যদিও বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে তিনি সেকালের জেনানা মিস্ট্রেস সরযূবালার কাছেও পাঠ গ্রহণ করেন|

অল্প আয়ুষ্কালের সংসার

১৯৩০ সালে বিয়ে হয় সুহাসিনীর| স্বামী সিলেটের কোটীচাঁদ প্রেসের সত্ত্বাধিকারী কোটীচাঁদ দাসের তৃতীয়পুত্র কুমুদ চন্দ্র দাস (১৯৩৫)| তাঁর বিয়ে হয়েছিল মাত্র ষোল বছর বয়সে| যুগের পক্ষে সেটি ছিল আইবুড়ো বিয়ে| দেখতে সুন্দরী ছিলেন সুহাসিনী| তাঁর আইবুড়ো বিয়ে নিয়ে গ্রামদেশে অনেক কথা প্রচলিত ছিল| তখন সুন্দরী কন্যার বাবারা বিয়েতে অনেক টাকা পণ নিতেন| কিন্তু সুহাসিনীর বাবা মেয়েকে সৎপাত্রস্থ করতেই রাজি ছিলেন, পণ গ্রহণে নয়| বিয়ের পর সুহাসিনীর মুক্তমনা স্বামী স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতা বেড়াতে গেলেন| ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে তাঁরা ভ্রমণ করেন পরেশনাথের মন্দির, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কলেজস্ট্রিট, বৌবাজার, বেলুড়মঠ, দক্ষিণেশ্বর, নবদ্বীপসহ নানা দর্শনীয় স্থান| তাঁদের কলকাতা ভ্রমণকালে বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত (১৮৮৫-১৯৩৩) মৃত্যুবরণ করেন| সুহাসিনীর সৌভাগ্য হয় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেয়ার| নেতার শবদেহ নিয়ে রাজপথে অনুসারীদের মিছিলে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি, তরুণ ছাত্রদের অপাপবিদ্ধ আনতশ্রদ্ধা পুস্পাঞ্জলি সুহাসিনীকে আবেগাপ্লুত  করে তোলে| নেতার প্রতি মানুষের ভালোবাসা তাঁকে বিস্মিত করে| এই অনুভূতি পরবর্তী জীবনে সুহাসিনীকে দেশসেবায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল বললে অত্যুক্তি হবে না| নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের বাবা জগন্নাথমিশ্রের বাড়িতে ভ্রমণ তাঁর মানসপ্রবণতায় ত্যাগ ও তিতিক্ষার উন্মীলন ঘটায়| সুহাসিনীর ছোট দেবর ফণীন্দ্র চন্দ্র দাস ছিলেন কবিয়াল| কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল| ১৯২৮ সালে নজরুল ইসলাম  যখন সিলেটে আসেন তখন এই ফণী কবিয়াল নজরুলকে গান শুনিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন| গীতিকার হিসেবেও তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল| খেয়াল (১৩৩১) নামে কোটীচাঁদ প্রেস থেকে তাঁর সংগীতের একটি প্রকাশনাও বের হয়েছিল| ১৩৩৩ বাংলায় খেয়ালের  দ্বিতীয় মুদ্রণও বের হয়েছিল| ১৬ শ্রাবণ, ১৩৪১ বাংলায় সুহাসীনীর স্বামী কুমুদরঞ্জন দাস যক্ষ্মা রোগে ভুগে মারা যান| সুহাসিনীর কোলে তখন একমাত্র সন্তান নিলীমা দাস| দু চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন সুহাসিনী| কিন্তু এই অন্ধকারের আবর্তে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চাইলেন না| আকাশে পারাবার বুঝি পার হবে/আমারে লও তবে, আমারে লও তবে (রবীন্দ্রনাথ) বলে তিনি যেন তাকিয়ে দেখতে চাইলেন স্বদেশের রূপ যা তাঁকে নিয়ে গেল মহৎ কর্মযজ্ঞে সম্রাজ্ঞী করবে বলে!

কর্ম ও সাধনা

সুহাসিনী বিধবা হন মাত্র বিশ বছর বয়সে| দেবর ফণীন্দ্রচন্দ্রের সুবাদে এবং শ্বশুর বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশের জন্যে সুহাসিনী কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার, হরিজন, প্রবাসী ইত্যাদি পত্রিকা পড়ার সুযোগ লাভ করেন| সিলেটে তখন স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ| সিলেট জেলার প্রথম বিপ্লবী অসিত ভট্টাচার্যের (১৯১৫-১৯৩৪) ফাঁসিতে সুহাসিনীসহ বাসার সবার অন্নজল বন্ধ হয়ে যায়| সময়ের দাবিতে ধীরে ধীরে সুহাসিনী পরিচিত হতে থাকেন বিপ্লবী ধীরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, বসন্তকুমার দাস (১৮৩৩-১৯৬৫), পূর্ণেন্দুকিশোর সেনগুপ্ত (১৮৯৫-১৯৭৮), অবলাকান্ত গুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে| পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনুসারী সতীশ রায়, নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী, বীরেশ মিত্র, সূর্যমনি দে সহ আরও অনেক বিপ্লবীর কার্যকলাপের সঙ্গে সুহাসিনী পরিচিত হতে থাকেন| বিপ্লবের এক অসহিষ্ণু জিজ্ঞাসা এবং আবেগ সুহাসিনীর মত অন্তপুরবাসী নারীকে দারুণভাবে স্পর্শ করে যায়| দেবর ফণীন্দ্র চন্দ্র দাস বাসার সব বইপত্র, পত্রিকা পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন বৌদিকে| শ্রীহট্ট মহিলা সংঘের কর্মী নরেশ নন্দিনী দত্ত (১৯০২-১৯৮৩) বাসায় এসে সুহাসিনীকে বাইরে যাবার জন্য অনুপ্রেরণা দিতেন| নরেশনন্দিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে রাজনৈতিক মতবাদ ও সদস্য সংগ্রহ করতেন| এভাবে ঘরে বসেই সুহাসিনী নরেশনন্দিনীর কাছে রাজনৈতিক খবরাখবর পেতে শুরু করেন| সে অর্থ তাঁর রাজনীতির প্রথমপাঠ সম্পন্ন হয় ঘরে বসেই নরেশনন্দিনীর কাছে| ১৯৩০ সালে ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেসের অনুসারী হয়ে   শ্রীহট্ট মহিলা সংঘ স্বাধীনতা দিবসের শোভাযাত্রা বের করে| এ শোভাযাত্রায় পুলিশি বাধার মুখেও জোবেদা খাতুন চৌধুরানী (১৯০১-১৯৮৬) স্বাধীনতার সংকল্প পাঠ করানোর মত দুঃসাহস করেন| এঘটনা সুহাসিনীর মনকে দারুণভাবে নাড়া দেয়| শ্রীহট্ট মহিলা সংঘ মহিলাদের মধ্যে দেশপ্রেম চাঙ্গা করার জন্য বিভিন্ন গৃহে সম্পন্ন করা যায় এমন কিছু কাজ যেমন চরকায় সুতা কাটা, খদ্দের কাপড় তৈরি, বাঁশ বেতের কাজ, কৃষিকাজ গো-পালন ইত্যাদিতে উৎসাহিত করত| তিরিশের দশকের প্রথম দিকে সিলেট শহরের এরকম উদ্যোমী কর্মযজ্ঞ সুহাসিনীর মনে দেশপ্রেমের দ্যোতিময় আবেগ তাঁকে আবিষ্ট রাখে| এদিকে স্বদেশি বিপ্লবীদের আনাগোনা তাঁদের বাড়িতেতো ছিলই, আর শ্রীহট্ট মহিলা সংঘের সদস্যদের কার্যকলাপ সুহাসিনীর মনে অপার শ্রদ্ধার জন্ম দেয়| ১৯৩৯ খিষ্টাব্দে মহিলা সংঘের  তিনদিন ব্যাপী সম্মেলনে সুহাসিনী যোগ দেন| ১৯৪০ সালে ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে সংকল্প করেন আজীবন তিনি খদ্দের পরিধান করবেন এবং সাধ্যমত দেশসেবা করবেন| আজীবন তিনি তাঁর সংকল্পে স্থিরচিত্ত ছিলেন| তিনি চরকায় সুতা কাটা শুরু করেন এবং ¯^দেশি বিপ্লবী ধীরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের নজরে পড়েন| ১৯৩৯ সালে তিনি কংগ্রেসের সদস্য পদ লাভ করেন| ১৯৪২ সালে ভারতছাড় আন্দোলনের সময় সুহাসিনী রাজপথের কর্মী হয়ে কাজ করার সুযোগ পান| ১৩ আগস্ট থেকে কর্মসূচি শুরু হয়| ৩১ আগস্ট সুহাসিনী সিলেট আদালত ভবনে পিকেটিং শুরু করেন| বন্দেমাতারাম ধ্বনিতে আদালত চত্বর তখন উত্তাল| এসময় নাটকীয় ঘটনার জন্ম দেন এই নারী নেত্রীরা| ইংরেজ জজকে তাঁরা চেয়ারে বসতে দেবেন না| জজ জোড় করে বসতে চাইলে মহিলারা জুতো ছুঁড়ে মারেন এবং এই ফাঁকে চেয়ারে বসে পড়েন বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ দেবের স্ত্রী স্নেহলতা দেব| বেলা গড়িয়ে যায় স্নেহলতা ঠায় বসে আছেনতো আছেনই| বিকেলে এক ফাঁকে তিনি উধাও হয়ে যান| শহরে শুরু হয় ধরপাকড়, গ্রেপ্তার হন সুহাসিনী দাস, স্নেহলতা দেব, নরেশনন্দিনী, চারুশীলা দেবসহ অনেকেই| ৯ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন    শ্রীহট্ট মহিলা সংঘের নেত্রী সরলাবালা দেব| জেলের অভিজ্ঞতা সুহাসিনীকে এই গর্বে গরবিনী করে তোলে যে তিনি দেশের জন্য রাজবন্দী হয়েছেন| ১৯৪৩ সালে মুক্ত হয়ে দেখেন ততোদিনে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে| একদিকে যুদ্ধের ভীতি অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে অস্থিরতা ও দিশাহারা ভাব| বাজারে চাল-ডাল-নুনের, পরিধেয় বস্ত্রের দাম বাড়তে থাকে| সুহাসিনী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন| প্রথমে রঙ্গিরকুল আশ্রম, সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় ত্রাণকাজে অংশ নেন| এ সময়ে আত্মরক্ষার জন্য প্রচারণার কাজে সুহাসিনী গ্রামে গ্রামে গিয়ে কাজ করেছেন| এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ মাথাছাড়া দিয়ে ওঠে| সিলেটের কংগ্রেসিরা চেয়েছিলেন অখণ্ড সিলেট, অন্যদিকে মুসলিম লিগ চায় পাকিস্তানে থাকতে| বৃটিশ তাড়াতে যাঁরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন এমন বাঘা বাঘা নেতা-নেত্রী ঘোলাটে পরিস্থিতিতে কর্তব্য ঠিক করতে না পেরে গড্ডালিকায় ভেসে যেতে লাগলেন| কিন্তু সুহাসিনী নিজের কর্তব্য ঠিক করতে সময় নিলেন না| ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে তিনি কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনী প্রচারনায় মাঠে থাকেন|

নোয়াখালী ট্র্যাজেডি ও মহাত্মা গান্ধী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে গান্ধীজী ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের ডাক দিয়েছিলেন| কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরে নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়| এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে বিবেকবান নেতারা  নোয়াখালী ছুটে যান| নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধীও ছুটে আসেন| সিলেট থেকে পূর্ণেন্দুকিশোর সেনগুপ্ত, নিকুঞ্জবিহারীসহ কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে যাবেন বলে ঠিক হয়| নোয়াখালীর ঘটনা সুহাসিনীর মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে| গান্ধীজী নোয়াখালী এসেছেন শুনে তাঁর মনটা আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে| ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ গোপাল দাসের নেতৃত্বে সুহাসিনী দাস, কিরণশশী দেব, নরেশনন্দিনী, লীলা দাসগুপ্ত রাতের ট্রেনে নোয়াখালী এসে পৌঁছান| ওই দিনই তাঁরা রামগঞ্জ পৌঁছান| বিকেলে তাঁরা হেঁটে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে যান| রাস্তাঘাটে বর্বরতার চিহ্ন- পোড়া বাড়িঘর, মাঝেমধ্যে শুধু ঘরের খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে! কোথাও কোনো জনমানব নেই, চারদিক খাঁ খাঁ করছে| এ রকম একটি জায়গায় গান্ধীজী ক্যাম্প করেন| জায়গাটার নাম শ্রীরামপুর| ক্যাম্পটিতে অত্যন্ত দীনহীনভাবে ছিলেন গান্ধীজী| এই প্রথম গান্ধীজীকে চাক্ষুশ দেখেন সুহাসিনী| শীর্ণকায়, একখণ্ড কাপড় পরিহিত, হাঁটুর ওপর সাধারণ ধুতিপরা এই মানুষটির অসাধারণ রূপ সুহাসিনীকে শ্রদ্ধায় আনত করে তোলে| সুহাসিনী গ্রামে কাজ করবেন শুনে গান্ধীজী খুশি হলেন| তাঁকে অভয়াশ্রম কর্মীদের সঙ্গে ফরিদগঞ্জ পাঠানো হয়| কারণ তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন নোয়াখালীতেই তিনি কাজ করবেন| সেখানে কাজের সূত্রেই  পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, আচার্য কৃপানলী, শঙ্কর রাও দেও, ঠক্কর বাপ্পা, রাম মনোহর, জগজীবন রাম, কুমার জানা প্রমুখ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ ঘটে সুহাসিনীর|

নোয়াখালীর দাঙ্গায় মহিলাদের উপর অত্যাচার হয়েছিল বেশি| এলাকায় লুট করা, জোর করে বিয়ে, ধর্মান্তরিত করা, ধর্ষণের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে সুহাসিনীর মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে| এদের পুনর্বাসন এবং চরকাকাটা, কুটিরশিল্প স্থাপন, বিদ্যালয় স্থাপন ইত্যাদি কাজে সক্রিয় হন সুহাসিনী| এসব কাজে তাঁর সঙ্গে কাজ করেন সিলেটের নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী, নরেশনন্দিনী দত্ত, কিরণশশী দেব| ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭ যখন আলুনিয়া গ্রামে কাজ করছিলেন সুহাসিনী তখন হঠাৎ বসন্তরোগে আক্রান্ত হন তিনি| পোড়াবাড়ির লোকেরা আন্তরিকভাবে সেবা করে তাঁর| ১৭ ফেব্রুয়ারি গান্ধীজী দেবীপুর আসবেন  এবং রাতযাপন করবেন শুনে অসুস্থ সুহাসিনী ভেঙে পড়েন| ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোর বেলা গান্ধীজী আলুনিয়া গ্রামে আসেন এবং সুহাসিনীর ঘরের সামনের ঘরে তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়| সুহাসিনী শুয়ে শুয়ে সব লক্ষ্য করলেন! বিকেলবেলা গান্ধীজীর নাতবউ আভা গান্ধী এসে জানালেন, বাপুজী দেখতে আসবেন| গান্ধীজী আলুনিয়ায় এসে যখন জানলেন তাঁর একজন কর্মী অসুস্থ, সন্ধ্যার প্রার্থনার পর সুহাসিনীর বিছানার পাশে এসে অভয় জানালেন সব ঠিক হয়ে যাবে । গান্ধীজী তাঁকে দেখতে আসছেন, সুহাসিনীর মন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে| নিজেকে পরম ভাগ্যবান মনে হয় তাঁর| নোয়াখালী সংখ্যালঘুদের  উপর নির্মমতা হয়েছিল, তিনমাস সর্বশক্তি দিয়ে  তিনি সে সব মানুষের পাশে থেকে তাদের সেবা করেছেন, তাদের পুর্নবাসনের  জন্য কাজ করেছেন এবং যদ্দিন পর্যন্ত না মানুষ নিজের বাড়িতে ফিরতে পেরেছে, জীবিকার সংস্থান শুরু করতে না পেরেছে ততোদিন সুহাসিনীরা  সেখানে ছিলেন| ২৪ মার্চ ১৯৪৭ সালে তাঁরা নোয়াখালী ছেড়ে কুমিল্লার অভয় আশ্রম হয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন|

সিলেটে গণভোটঃ বিচ্ছিন্ন মাটি ও মানুষ

ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ১৯৪৬-৪৭ সালে উত্তাল হয়ে ওঠে| ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ এটলি ঘোষণা দেন ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যেই বৃটিশরা ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা দিয়ে চলে যাবে| তখন মুসলিম লিগ চায় আসাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হোক| অন্যদিকে কংগ্রেস ও ওলামায়ে হিন্দ এর বিরোধিতা করে| শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় গণভোটই সিলেটের ভাগ্য নির্ধারণ করবে| ৬ ও ৭ জুলাই ১৯৪৭ সিলেটে গণভোটের তারিখ নির্ধারণ হয়| গণভোটে সারা গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত প্রকম্পিত হয়ে ওঠে| চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার প্রদানের জন্য দাবি জানায় কংগ্রেস, কিন্তু তারা ভাসমান জনসংখ্যা বলে গ্রাহ্য করা হয় না| সুহাসিনী চা শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করেন| গণভোট সামনে রেখে কংগ্রেস গ্রাম সেবা দল গঠন করে| সুহাসিনী গ্রাম সেবা দলে কাজ করেন সিলেটের বিভিন্ন গ্রামে| ১৪ জুন গণভোটের ফলাফল জানা গেল ৫৫,৫৭৮ ভোটের ব্যবধানে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার রায় হয়| পক্ষে পড়ে ২,৩৯,৬১৯ ভোট; বিপক্ষে ১,৮৪,০৪১ ভোট| ইতিহাসে সিলেটের গণভোটের কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে অনেক রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ সিলেটের মানুষের হৃদয়কে রক্তাক্ত করেছে, তার ঘা শুকায়নি আজ অবধিও| গ্রেটবৃটেন সরকার স্যার প্যাথিক লরেন্সের নেতৃত্বে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল গণভোটের আগে| এই প্রতিনিধি দলকে বলা হয় কেবিনেট মিশন| ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে এ মিশন ভারতে পৌঁছান| কেবিনেট মিশনের প্রস্তাব ছিল হিন্দু ও মুসলিম প্রধান অঞ্চল দুটো পর্যাপ্ত স্বায়ত্বশাসন ভোগ করবে তবে দেশভাগ হবে না| কেন্দ্রীয় সরকার ফেডারেল সরকার হিসেবে মাত্র কয়েকটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবে| সিলেটের বেশিরভাগ মানুষ বিশেষ করে কংগ্রেসিরা এটি মেনে নেয়নি| তাই কোনো সুরাহাও হয়নি| অন্যদিকে আসামে তখন কংগ্রেসের মন্ত্রিসভা, তার নেতা গোপীনাথ বরদলৈ| সিলেট কংগ্রেসের ছিল তার ওপর অগাধ বিশ্বাস| কিন্তু তিনি সিলেটকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তিতে অনাপত্তি জানান (Wavel, the Victory’s Journal, April 1946, P. 234) তাই সিলেটের ভূখণ্ড ও মানুষের হৃদয়ও ভাগ হয়ে যায়| হিন্দুদের বাড়িঘর ব্যবসা বিক্রি করে ভারতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি সুহাসিনীকে হতবিহ্বল করে দেয়| অনেকেই কংগ্রেসকে গালি দিতে থাকে| তাদের ধারণা, কংগ্রেস ও রাজনীতিই তাদের দেশছাড়া করছে| সুহাসিনীরা তাদের কাছে গেলেন, বোঝালেন কিন্তু কোনো লাভ হল না| ওপার থেকেও কিছু মুসলিম পরিবার আসতে শুরু করল সিলেটে| বিচলিত মন নিয়ে সুহাসিনীরা কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন আর বসে থাকা চলবে না| তাঁরা মানুষের দ্বারে দ্বারে গেলেন| ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর সুনামগঞ্জ এবং ২২ ডিসেম্বর থেকে একটানা ২৬ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জ মহকুমা জনসংযোগ করেন| ৯ ডিসেম্বর  ১৯৪৭ কুলাউড়া কর্মী ভবনে পূর্ণেন্দুকিশোর সেনগুপ্তের নেতৃত্বে সুহাসিনী দাসসহ কয়েকজন সিদ্ধান্ত নেন কোনো অবস্থাতেই তাঁরা দেশ ছাড়বেন না| কথাটি আমৃত্যু স্মরণ রেখেছেন সুহাসিনী দাস তাঁর দর্শন ও জীবনাচরণে|

রঙ্গিরকুল আশ্রম ও ভয়াল ১৯৭১

১৯২৫ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সর্বত্যাগী কর্মীরা গড়ে তোলেন রঙ্গিরকুল বিদ্যাশ্রমটি| দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করা ও উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে মানবসেবা করাই ছিল এ আশ্রমের প্রধান উদ্দেশ্য| সুহাসিনী ১৯৪৯ সালে কস্তুরবা ট্রেনিং নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ীভাবে রঙ্গিরকুল আশ্রমে চলে যান| সেখানে মানবসেবার ও ভালোবাসার এক নিষ্ঠাবান সৈনিক হিসেবে নিজেকে তিনি পরিচিত করে তোলেন| ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় সৈন্যরা আশ্রমে ব্যারাক করে  ফেলে| অনেক ঝড়ঝাপ্টা মাথায় নিয়ে সুহাসিনী আশ্রমের কর্মাদি এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন| এ সংগ্রামের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ| ১৯৭১ সালের ভয়াবহ দিনগুলির কথাতেই চলে আসি| অনাথশিশুদের নিয়ে একা সুহাসিনী মৌলভীবাজারে রঙ্গির কুল আশ্রমে| ২৫ মার্চের পর সুহাসিনী একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েন| কাছে কুলাউড়া শহরে গুলাগুলি, ধড়পাকড় ও হত্যা, আক্রান্ত চা বাগানে মানুষের আহাজারি এবং অনাথ শিশুদের দায়িত্ব তাঁকে আরও বিপন্ন করে তোলে| চারদিকে ভয়াল সব সংবাদ| এরই মধ্যে আশ্রমের একমাত্র পুরুষ সদস্য জীবন সাহাকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা| সুহাসিনীর কাকুতি-মিনতি ও চোখের জল তাদের মন গলাতে পারেনি| অন্যদিকে সুহাসিনীর কর্মসহযোগী বলতে গেলে গুরু পূর্ণেন্দুকিশোর ও নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তিনি! দিনশেষে আশ্রমকর্মী জীবন সাহা বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে আসেন| কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যদের মানসিক নির্যাতনে ফিরেই জ্বরে পড়লেন| যে জীবন সাহা মহাত্মা গান্ধীর ডাকে বিপ্লবী হয়ে ঘর ছেড়েছিলেন| বিনা চিকিৎসায় আত্মীয় পরিজনহীন পরিবেশে এক সময়ের স্বদেশি জীবন সাহা রঙ্গিরকুল আশ্রমে ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন| সুহাসিনী অনাথ বাচ্চাদের ফেলে কোথাও সরে যাবেন তারও কোনো  উপায় ছিল না| ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ১৭ ডিসেম্বর সুহাসিনী সিলেটে এসে পৌঁছান| এসে দেখেন লণ্ডভণ্ড সিলেট শহর, চারদিক নিরব| মাঝে মধ্যে জয়বাংলা ধ্বনিটি যেন মৃত শহরকে জাগিয়ে রাখছে| একে একে সুহাসিনী দেখতে গেলেন সিলেটের বধ্যভূমিগুলো! নারী নির্যাতন কেন্দ্রগুলো, লুন্ঠিত বাড়িঘর; সুহাসিনীর নিজের বাড়িতেও কোনো জিনিসপত্র অবশিষ্ট ছিল না| পাকিস্তানি সৈন্যদের এমন নিষ্ঠুরতার অভিজ্ঞতাই সুহাসিনীকে যুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে| আমৃত্যু তিনি যে উমেশ্চন্দ্র নির্মলাবালা ছাত্রাবাসের দায়িত্ব পালন করছিলেন সেখানেই এসব নির্যাতিতা নারীদের পুর্নবাসনকেন্দ্রে পরিচালকের দায়িত্ব নেন| মেয়েদের স্বাবলম্বী করার জন্য বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষাসহ তাদের আইনি সহায়তা, বিয়ের ব্যবস্থা করা, অভিভাবকদের কাছে ফেরত পাঠানো ইত্যাদি কাজ আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে করছিলেন| বাংলাদেশের কোন ছাত্রাবাসকে কেন্দ্র করে এভাবে নির্যাতিতাদের পুনর্বাসন সে সময়তো বটেই, বর্তমান সময়েও একটি নজিরবিহীন ঘটনা!

শেষকথা

সুহাসিনী দাসের মত এমন ত্যাগী দেশপ্রেমী বর্তমান সমাজে বিরল| গ্রাম থেকে আসা এক স্বল্পশিক্ষিত কিশোরী কীভাবে দেশচেতনায় নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, যে অবদানের খবরও তিনি রাখলেন না সারা জীবন একটিবার| তাঁর ত্যাগনিষ্ঠা ও দেশভক্তির দৃষ্টান্ত তাঁর দীর্ঘজীবন জুড়েই ছড়িয়ে আছে| মায়ের মত দেশকে সেবা করতে গিয়ে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন দেশ-সমাজের মা-মাসিমা| তাই ক্ষুদ্র পরিসরে তাঁর সবটুকু বিশ্লেষণ করা খুব কঠিন এবং কষ্টের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়| বর্তমান তরুণ রাজনীতিক ও সমাজকর্মীকে সুহাসিনী দাসসহ সকল বিপ্লবীর ত্যাগ ও তিতীক্ষার শিক্ষায় দীক্ষা গ্রহণ খুবই দরকার|

তথ্যসূত্র

১. সুহাসিনী দাস সংবর্ধনা গ্রন্থ, সম্পাদনা পরিষদ, এপ্রিল ১৯৯৯|

২. সুহাসিনী দাস, সেকালের সিলেট, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ২০০৫|

৩. সুহাসিনী দাস, নোয়াখালীর : ১৯৪৬, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ২০০৪|

৪. দীপংকর মোহান্ত, উমেশচন্দ্র-নির্মলবালা ছাত্রাবাস: ৫০ বছরের গৌরবের জয়ধ্বনি, আমাদের শান্তি নিকেতন সংকলন ও সম্পাদনা সুমন কুমার দাশ, চালিবন্দর, সিলেট ২০১৩|

৫. ড. নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ, মুক্তি মঞ্চে নারী, জুন, ১৯৯৯, পিপটাস্ট, ঢাকা|

৬. সুমন কুমার দাশ, (সম্পাদনা) আশ্রম মাতা : স্মরণিকা উমেশচন্দ্র-নির্মলবালা ছাত্রাবাস, চালিবন্দর, জুন ২০০৯ সিলেট|

৭. কৃষ্ণকুমার পাল চৌধুরী, সর্বত্যাগী দেশকর্মী, সিলেট ১৯৮৭|

লেখক- কবি-প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক বাংলা বিভাগ, সরকারি মদনমোহন কলেজ, সিলেট|