হোম » প্রত্নতত্ত্ববিদ আ ক ম জাকারিয়ার জীবন-সংগ্রামের গল্প

প্রত্নতত্ত্ববিদ আ ক ম জাকারিয়ার জীবন-সংগ্রামের গল্প

আ ক ম জাকারিয়া

শৈশবে ছিলেন ক্রীড়াপাগল| পড়ালেখা করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে| কর্মজীবন শুরু শিক্ষকতা দিয়ে| পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে অবসর নিয়েছেন আমলা (সচিব) হিসেবে| এসব কিছু ছাপিয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে| তিনি প্রত্নবিষয়ে লেখক, বাংলা একাডেমি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া-আ ক ম যাকারিয়া| অভাব-অনটনকে উপেক্ষা করে জীবন সায়া‎হ্নে ৯৭-৯৮ বয়সেও শুয়ে শুয়ে লেখালেখির চর্চা করে গেছেন তিনি| ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তাঁর ঢাকার পান্থপথের বাড়িতে ইতিহাসেরখসড়া  সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুল হককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জীবন-সংগ্রামের গল্প শুনিয়েছেন ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল তথা ত্রিকালদর্শী এই লেখক| কিন্তু নানা কারণে সাক্ষাৎকারটি যথাসময়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি| টেপ রেকর্ডে ধারণকৃত সাক্ষাৎকারটি পরে ইতিহাসের খসড়ায় (ম্যাগাজিন) ছাপা হয়| প্রসঙ্গত ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এই প্রবীণ প্রত্নতত্ত্ববিদ মারা যান|

ইতিহাসেরখসড়া  সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুল হককে দেওয়া সাক্ষাৎকার

* আপনার জন্ম, শৈশব জীবন সম্পর্কে কতটুকু মনে পড়ে? 

** আমার জন্মের আসল তারিখ জানা নেই| তবে সনদ অনুযায়ী ১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াকান্দি গ্রামে আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা| প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছি দরিয়াকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এবং মাধ্যমিক পাস করেছি ১৯৩৯ সালে রূপসাদি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে| শৈশব থেকে পারিবারিক অভাব-অনটনের মধ্যেই আমি বেড়ে উঠেছি| তার মধ্যেও খেলাধূলার আনন্দময় পরিবেশে অনেকটা সময় কেটেছে| তখন আমি ভালো খেলোয়াড় ছিলাম, বিশেষ করে ফুটবল ছিল আমার প্রিয় খেলা| জেলায় এমন কোনো মাঠ ছিল না, যেখানে আমাকে খেলতে নিয়ে যাওয়া হয়নি| স্থানীয় দল ছাড়াও ঢাকা কলেজের টিমের সদস্য হিসেবে এ ডিভিসন এবং সলিমুল্লাহ হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেও খেলেছি|

* এরপর তো ঢাকায় এসেই পড়ালেখা শেষ করলেন|

** হ্যাঁ, ম্যাট্রিক পাসের পর আমি ঢাকা এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই| ছাত্র হিসেবে ভাল হওয়া সত্ত্বেও ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করতে না পারায় মনে দুঃখ ছিল| ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে মেধা তালিকায় দশম স্থান অধিকার করতে পেরে আনন্দিত হয়েছিলাম| পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করি| আমার বন্ধু কে এম আহসানের সঙ্গে আমি যুগ্মভাবে দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম হয়েছিলাম|

* চাকরি জীবন সম্পর্কে বলুন| 

** আমার চাকরি জীবনের শুরু ১৯৪৬ সালে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে| পারিবারিক অবস্থা ও চাকরির নিরাপত্তার কথা ভেবে সরকারি চাকরির কথা ভাবছিলাম| আমাদের সময় ছিল বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস| ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকারের শেষ দিকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ পেয়ে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিই| পাকিস্তান হওয়ার পর বিভিন্ন থানা, মহকুমা, জেলায় পর্যায়ক্রমে সার্কেল অফিসার, ডেপুটি কালেক্টর, মহকুমা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি| ১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে আপনাদের চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ মহকুমার (কক্সবাজার) প্রশাসক এবং ১৯৭০-৭১ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি| স্বাধীনতার পর যুগ্ম-সচিব ও সচিব হই| ১৯৭৬ সালে শিক্ষা ও সংস্কৃতিসচিব থাকাকালে জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে আমাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়| তখনো চাকরি শেষ হওয়ার দেড় বছর বাকি ছিল আমার|

* বাধ্যতামূলক অবসরে-মানে জোর করে অবসর? কেন?

** আমি সংস্কৃতি সচিব থাকার সময় এই মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছিলাম| শুনেছি, ওই লোক জিয়াউর রহমান সাহেবের সহপাঠী ছিলেন এবং সেই সুবাদে দুজনের মধ্যে বেশ খাতির ছিল| ওই লোক নাকি জিয়াউর রহমান সাহেবকে বলেছিলেন, আমি অসৎ লোক| জিয়া সাহেবতো আমাকে চিনতেন না| ওই অসৎ লোকটির কথায় আমাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়| অবসরের সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা গ্র্যাচুইটি এবং এক হাজার দুই শ টাকা পেনশন দেওয়া হয়|

* আপনি কোনো প্রতিকার চাননি?

** কার কাছে চাইব? তখন শিক্ষামন্ত্রীর মর্যাদায় শিক্ষা উপদেষ্টা ছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজল| আমি চট্টগ্রাম থাকতে তাঁকে একজন সাহিত্যিক হিসেবে ভাল জানতাম| পরেও জেনেছি উনি খুব ভাল লোক, বড় মাপের মানুষ| আমাকে অবসরে দেওয়ার ব্যাপারে তাঁকেও কিছু বলা হয়নি| উল্টো তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনাকে অবসর দেওয়া হলো কেন? আমি তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি আমার মন্ত্রী, আপনি জানেননা? তখন তিনি হেসে বললেন, সময়টাতো আমাদের না| আপনার যে রেকর্ড আমি দেখলাম, সেরকম ভাল রেকর্ড তো কোনো অফিসারের নেই| আসলে মানুষ হিসেবে আবুল ফজল খুবই ভদ্রলোক হলেও ওনাদের মতো লোকদের কোনো ক্ষমতা ছিল না| সব ক্ষমতা ছিল জিয়াউর রহমানের হাতে|

* আপনি চাকরি জীবনের পাশাপাশি দেশে প্রত্ন আবিস্কার ও প্রত্ন সম্পদ নিয়ে অনেক গবেষণা ও লেখালেখি করেছেন| এদুটো বিষয় একসঙ্গে চালানোর ব্যাপারে অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পেয়েছেন?

** আমি বগুড়া আজিজুল হক কলেজে অধ্যাপনা করার সময় সেখানে অধ্যক্ষ ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ| একদিন রংপুর কারমাইকেল কলেজের কিছু ছাত্র মহাস্থানগড় ভ্রমণের জন্য এসে আমাদের সাহায্য চায়| ড. শহীদুল্লাহর অনুরোধে আমি ওদের সঙ্গে মহাস্থানগড় যাই| সেখানে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক টিলা আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে| আমার মনে হয়েছে এসব টিলার আড়ালে রয়েছে প্রচুর প্রত্নসামগ্রী| ইতিমধ্যে সরকারি চাকরির সুবাদে ১৯৫৮ সালে আমি প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকা যাই| এরই মধ্যে দেড় মাসের ছুটি নিয়ে গ্রিস, ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ঘুরতে গিয়ে ওইসব স্থানে অনেক প্রত্নসম্পদ দেখে আমি মুগ্ধ হই| আমার মনে পড়ে আমাদের মহাস্থানগড় প্রত্ন নিদর্শনের কথা| আমেরিকা থেকে এসে দিনাজপুরের রাজস্ব বিভাগের জয়েন্ট কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাহাড়পুরখ্যাত সীতাকোট বিহার আবিষ্কার করি| পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭-৬৮ সালে আমি আবার দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক থাকাকালে সীতাকোট বিহার খননের ব্যবস্থা নিয়ে সেখানে প্রত্নসম্পদ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করি| এ ঘটনা আমাকে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে আরও বেশি আগ্রহী ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে|

* প্রত্নতত্ত্ব বা প্রত্ন সম্পদসহ ইতিহাস আশ্রিত অনেক বই লিখেছেন| সরকারি দায়িত্বপূর্ণ কাজে থেকে এরকম সিরিয়াস বিষয়ে লেখালেখি সাধারণত দেখা যায় না|

** চাকরিতে থাকার সময় নাথ সাহিত্যের ওপর একটি পাণ্ডলিপি পেয়েছিলাম| সেটি পড়ে আমিও আমার মতো করে লেখালেখি করার মনস্থ করি| ১৯৭০-৭১ সালে আমি সিডিএ (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের) চেয়ারম্যান ছিলাম| কিন্তু সেখানে টাকার অভাবে তেমন কোনো কাজ ছিল না বলেই চলে| এই অলস সময়টাকে আমি লেখালেখির কাজে লাগাই| তবে স্বাধীনতার পর মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর কাজের চাপে লেখালেখি বন্ধ হয়ে যায়| ৭৬ সালে অবসরে আসার পর আবার লেখালেখি শুরু করি, যা ছাড়তে পারিনি এই বুড়ো বয়সেও| (২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় তাঁর বয়স চলছিল ৯৭ বছর)

* আপনি যে লেখাপড়ায় এতদূর এগিয়েছেন এর পেছনে কার অনুপ্রেরণা ছিল?

** আমার বাবা এমদাদ আলী মিয়া ছিলেন ফার্সি ও আরবি ভাষার পণ্ডিত, পুথি সাহিত্যের সমঝদার| তিনি ছিলেন ইংরেজি শিক্ষার বিরোধী| কিন্তু ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষার প্রাধান্যের যুগে আরবি-ফার্সি জানা লোকদের চাকরি পাওয়া মুশকিল ছিল| ফলে বাবা ছিলেন অনেকটা দরিদ্র কৃষিজীবী| বিষয়টি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এবং আমাকে ইংরেজি শিক্ষায় উৎসাহিত করেছেন| আমাকে খুব কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন আমার বাবা| মায়ের কাছ থেকেও তাগাদা পেয়েছি| ছাত্র হিসেবে ভাল ছাত্র ছিলাম| ভাল রেজাল্ট হওয়ায় পড়ালেখা আরও বেশি করার জন্য আমি উৎসাহিত হই|

* আপনার ভাইদের মধ্যে আর কে কি করছেন -তাদের পড়ালেখা কতটুকু? গ্রামের বাড়ির সাথে সম্পর্ক কেমন?

** বড় ভাই দারোগা ছিলেন ব্রিটিশ আমলে| ৫৪ সালে তিনি মারা যান| মেঝো ভাই সংসারের দেখাশোনা করতেন| পারিবারিক অসুবিধার জন্য তিনি লেখাপড়া তেমন করতে পারেননি| তিনি বেঁচে নেই| ছোট ভাই বিএ পাস করে ব্যবসা শুরু করেছিল| সেও অপরিণত বয়সে মারা গেছে|

বাড়িঘরে (গ্রামে) যাওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা এখন আমার নেই|  ২০১৩ সালে আমার স্ত্রী একবার নিয়ে গিয়েছিল| আমার সেখানকার সম্পত্তি দেখাশোনা করতো আমার মেঝো ভাইয়ের ছেলে| সে মারা যাওয়ার পর ওই সম্পত্তি এমনিতেই পড়ে আছে| তবে উল্লেখ করার মতো বেশি সম্পত্তি আমার নেই| এখানকার (ঢাকার) এই বাড়িটা আমাদের পারিবারিক সম্পদ|

* আপনার চাকরি এবং সঙ্গে লেখালেখি, প্রত্নসম্পদ নিয়ে গবেষণা, ঘোরাঘুরি করেছেন| অবসরেও লেখালেখি করছেন| এসব বিষয় সংসারের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়েছে? আপনার স্ত্রী সব মেনে নিয়েছেন?

** আসলে এসব তো কোনো স্ত্রীই পছন্দ করে না| কারণ এসব করলে তো সংসারে প্রয়োজনমতো সময় দেওয়া যায় না| আর্থিক ভিত মজবুত হয় না| তবে আমার ওপর তেমন প্রভাব পড়েনি| এই বয়সে আমার স্ত্রীর অনেক সহযোগিতা পেয়েছি|

স্ত্রীর সাথে আ ক ম জাকারিয়া

* বলছিলেন আপনি চট্টগ্রাম সিডিএ-তে চেয়ারম্যান ছিলেন| টাকার অভাবে কাজ হচ্ছিল না| তখন পাকিস্তান আমল| সরকার কি উন্নয়নের জন্য টাকা দিত না?

** কোতোয়ালীর মোড়ে বর্তমানে যে সিডিএ ভবনটা, সেটা তো তখনো ছিল| প্রধান প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অনেকে ছিল| শুধু উন্নয়নের জন্য টাকা ছিল না| ফলে আমাদের তেমন কাজও ছিল না|  সরকার যে সামান্য টাকা দিত সেগুলো মেনটেন্যান্স খাতে চলে যেত| উন্নয়ন কাজের জন্য টাকা না পাওয়ায় রাস্তাঘাট-যোগাযোগ খাতে উন্নয়ন করতে পারিনি| আমি সরকারকে বলছিলাম, টাকা না থাকলে উন্নয়নকাজ তো হবে না| আর টাকা দিতে না পারলে এই প্রতিষ্ঠানটা রেখেই কি লাভ? কিন্তু সরকার তা কানে তোলেনি|

* আপনিতো স্বাধীনতার কিছুদিন পরও চট্টগ্রামে ছিলেন| তারপর ঢাকায় এলেন সচিবালয়ে| তার আগে সময়টা কাটতো কিভাবে?

** কাজ না থাকায় অফুরন্ত অবসর সময় তখন পেয়েছি| আমি তখন ঠিক করি এই অবসরটা লেখালেখির কাজে লাগাই| গোপীচন্দ্রের সন্যাস  নামে একটা বই নিয়ে গবেষণা করি| নাথ সম্প্রদায়ের ওপর লেখা বই| বিভিন্ন বিষয়ে নোট করতাম| স্বাধীনতার পরই এক পর্যায়ে আমার ঘনিষ্ট জন বন্ধুপ্রতীম সিএসপি কর্মকর্তা খান শামসুর রহমানকে (আগরতলা মামলার আসামি) বললাম, এখানে কোনো কাজ নেই, থেকে লাভ কি, আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যান| তিনি তখন আমাকে মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম-সচিব পদে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন| এর আগে তিনিও সিডিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন গেছেন| যাহোক, মন্ত্রণালয়ে এসে আর নড়চড়া করার সময় পাইনি| সদ্য স্বাধীন দেশ, মন্ত্রণালয় চালানোর মতো তেমন লোকজন ছিল না| আমাকে একাই তিনটা মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম-সচিবের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে| রাত ১০টা-১১টা পর্যন্তও কাজ করেছি অনেক সময়| তাই কয়েক বছর লেখালেখি আর হয়নি| পরে অবসরে এসে তা আবার শুরু করি|

* চট্টগ্রামে থাকার সময় সেখানকার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের সম্পর্কে আপনার কেমন ধারণা ছিল? 

** চট্টগ্রামের অনেক লোকের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ছিল| এত বছর পরে সবার কথা মনে নেই| পটিয়ার কে এম আহসান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী-বন্ধু| আগেই বলেছি তার সঙ্গে আমি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে যুগ্মভাবে দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম হয়েছিলাম| অবশ্য চাকরিতে সে আমার এক বছর পর আইপিএস পরীক্ষায় পাস করে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে ভাল অফিসার হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছে| অধ্যাপক আবুল ফজলকে তখন জানতাম একজন গুণি লেখক-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী হিসেবে| আমার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন চুনতির উমেদ আলী খান| প্রফেসর মইনুদ্দিন খানও আমার বন্ধু, যদিও আমার জুনিয়র|  মোগল আমল থেকে তাদের উজ্জ্বল পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল|

* এ পর্যন্ত কোন কোন বিষয়ে কতটা বই বেরিয়েছে? এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য বই কিকি?

** আমি প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য নিয়ে লিখেছি| এ ছাড়া, ফরাসি সাহিত্যের পাঁচটি বই অনুবাদ করেছি| গ্রাম বাংলার হাসির গল্প লিখেছি দুই খণ্ড| সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত (২০১৪) ১৫ টি বই বেরিয়েছে| উল্লেখযোগ্য বলতে পারেন বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ, বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তি (২য় খণ্ড), বাংলা সাহিত্যে গাজী-কালু ও চম্পাবতী উপাখ্যান, গুপিচন্দ্রের সন্যাস, দিনাজপুর মিউজিয়াম. কুমিল্লা জেলার ইতিহাস, বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস ইত্যাদি| আর একটা বইয়ের কাজ চলছে| তবে আগের মতো শক্তি নেই| বসে তেমন লিখতে পারি না| শুয়ে শুয়েই লিখতে হয়|

* এই যে এতগুলো বই প্রকাশ হলো, লেখালেখি করছেন, নিশ্চয়ই লেখকসম্মানি বা বই বিক্রির টাকায় সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা এসেছে|

** নারে ভাই, টাকা দেয় না কেউ! এ পর্যন্ত ১৫ টা বই বেরিয়েছে| সব মিলিয়ে মাত্র ৯০ হাজার টাকার মতো পেয়েছি| এগুলো খুবই অল্প| বইগুলোর কাটতি হয় যথেষ্ট, অথচ টাকা দেয় না প্রকাশকরা|

বাংলা একাডেমি ৭ টা বই করেছে| একটার টাকা দিয়েছে আট হাজার টাকা| শিশু একাডেমি একটার টাকা দিয়েছে| ওই টাকা আমার ছোট ছেলেটার চিকিৎসার জন্য খরচ করেছি| এই প্রথম প্রথম আলো ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দিল| তাও চেয়ে নিয়েছি| কারণ অসুবিধায় আছি| আমার বাড়ির ছাদটায় ফাটল ধরেছে| এটা মেরামত করতে প্রায় আড়াই লাখ টাকা লাগছে| এই বাড়িটা দোতলা ছিল| অবসরের পর গ্রামের জমিজমা কিছু বিক্রি করে একতলা বাড়িয়ে তিন তলা করেছি| তিন তলায় মোট ৬টি ফ্ল্যাটের ৩ টি ভাড়ায় দিয়েছি| ২ ফ্ল্যাটে দুই ছেলে আর একটাতে আমি থাকি|

* ছেলেরা সাহায্য করেন?

** ছেলেরা তাদের সংসার চালাতেই হিমশিম খায়|

* রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন কখনো?

* ১৯৪২ সালে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম পাকিস্তানের পক্ষে| একবার নাটোরে নির্বাচনী কাজেও অংশ নিয়েছিলাম ছাত্রদের সঙ্গে| লেখাপড়া ছেড়ে প্রায় ২ মাস সেখানে অবস্থানও করেছিলাম| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সংবাদ পেয়ে সবাই চলে যাই নিজ এলাকায়| এরপর লেখাপড়া, পরিবার, সংসার, চাকরি, লেখালেখি ইত্যাদির টানাপড়েনে রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো হয়নি| সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সরকারি নিয়মকানুনের মধ্যে চাকরি করে গিয়েছি| এরপর আবার লেখালেখি|

* চাকরি ও ব্যক্তিজীবনে দুঃখের স্মৃতি থাকলে বলুন|

** আমার প্রথম দুঃখ ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করতে পারিনি| দ্বিতীয়ত, আমাকে যখন অবসরে পাঠানো হয় ৭৬ সালে, তখন আমার বেতন ছিল তিন হাজার টাকা| বিনা দোষে অকাল অবসরে পাঠানোটা ছিল আমার জন্য দুঃখজনক| আমার আর এক বড় দুঃখ, আমার ছোট ছেলেটার ব্রেন টিউমারে মৃত্যু| তার হার্টের সমস্যা ছিল| সাড়ে ১১ বছর বয়সে তাকে ভেলুর থেকে হার্টের অপারেশন করিয়ে এনেছিলাম| কিন্তু তার ব্রেনের টিউমার যে ছিল সেটি ধরা পড়েনি| ৯৯ সালে সে মারা যায়| সে অত্যন্ত মেধাবী ছিল|

* কাজের অর্থাৎ লেখালেখির জন্য সম্মাননাও তো পেয়েছেন|

** পদক তো দিয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা| সবগুলো কি আর মনে আছে! বাংলা একাডেমি ও রাষ্ট্রীয় একুশে পুরস্কার পেয়ে মনে হয়েছিল কাজের স্বীকৃতি পেয়েছি| এ ছাড়া, এশিয়াটিক সোসাইটি ম্যান অব দি ইয়ার গোল্ড মেডেল দিয়েছে| ইতিহাস পরিষদ ও ইতিহাস একাডেমি পুরস্কারও পেয়েছি|

* এখন তো আপনার বয়স প্রায় ৯৭ বছর| এইযে জীবনের ৯৭ টি বছর কাটলো, সুখ-দুঃখ মিলিয়ে সার্বিকভাবে জীবনটাকে কীভাবে দেখছেন|

** হ্যাঁ আর সপ্তাহখানেক পর-১ অক্টোবর (২০১৪) আমার বয়স হবে ৯৭ বছর| জীবনের শুরু থেকে যুদ্ধ করতে করতেই এগিয়েছি| এখনো দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছি| আমাদের সময় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হওয়াটা ছিল তখনকার দিনে বড় চাকরি| তখন বেতন ছিল ৩০০ থেকে সাড়ে ৭০০| জেলা পর্যায়ে গেলে হতো সাড়ে ১১ শ থেকে ২১৭৫ টাকা| বেতন বাড়ে বছরে ২৫ টাকা| খরচও বাড়ে বছর ধরে| ফলে সংসার চালাতে হয়েছে যুদ্ধ করে করে| পেনশন, গ্রাচুইটি যা পেয়েছি তাও সামান্য| পুরোনো এই বাড়ির ছাদের ওপর বাগান করার শখ ছিল| কিন্তু ছাদ নষ্ট হওয়াতে তা আর হয়নি| এ ছাড়া, শখ আর করি কি করে—দ্রারিদ্রের সঙ্গে চিরদিন যুদ্ধ করে আসছি| জায়গা-জমি বেশি কিন্তু ছিল না| চাকরি করে কিছু সঞ্চয় এবং পেনশনের টাকায় কোনো রকমে চলেছি| জায়গা জমি সামান্য যা ছিল তারও কিছু বিক্রি করে সংসারে যোগান দিয়েছি| দারিদ্রের সঙ্গে সব সময় যুদ্ধ করে এসেছি, এখনও করছি|

*  আপনার জন্ম ১৯১৮ সালে| কাজেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক স্মৃতি জানা থাকার কথা| সেই স্মৃতিকথার খানিকটা শুনতে চাই|

** ১৯৪০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই| তখনো যুদ্ধের আঁচ ভালো করে বুঝতে পারিনি| তবে বছর দুয়েক পর তা ভালভাবে বুঝতে পেরেছিলাম, যখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল| কত লাখ মানুষ যে মারা গেছে সে সময় তার হিসেব করা মুশকিল ছিল| তখন আমরা বাড়ি যেতাম স্টিমার সার্ভিসের মাধ্যমে| যাওয়া-আসার পথে নদীতে কত যে লাশ ভাসতে দেখেছি! কবর দেওয়ার লোকও অনেক জায়গায় ছিল না| ছিল না দাহ করবার লোকও| দীতে বিকৃত লাশ দেখে বাড়িতে গিয়ে মাকে বলেছিলাম আমাকে মাছখাওয়াবে না, সাগরে যা দেখেছি।| মা আমার জন্য মুরগী জবাই করেছিলেন| অন্তত ৫০লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল সে দুর্ভিক্ষে| যেটাকে বলা হতো ৪৩ এর দুর্ভিক্ষ| ওই বছর নতুন ধান যখন এলো, সেই ধানের ভাত খেয়েও অনেক লোক মারা গেছে| আমাদের পরিবারটা কোনোভাবে বেঁচে গেছে| তবে আত্মীয়দের মধ্যে মারা গেছে অনেকে| দুর্ভিক্ষ যখন শুরু হয় তখন চালের মণ ছিল আড়াই টাকা থেকে ৩ টাকা| কিছুদিনের মধ্যে সেই চালের মণ হয়ে যায় ৮০ টাকা| আপনি চিন্তা করতে পারবেন না যে কী অবস্থায় মানুষ দিন কাটিয়েছে| এমন অবস্থা হয়েছে যে, কেউ কবরস্থানে লাশ নিয়ে গেছেন| যে লাশ নিয়ে কবর খুঁড়তে গেছেন, তিনি ওই লাশ দাফন করে এসে আরও ২-৩ জনের লাশ নিয়ে দাফন করতে হয়েছে| এটা আমার জেলার অবস্থা। সারা দেশেরই অবস্থা একই ছিল| সলিমুল্লাহ হলে আমরা থাকতাম| ঢাকায় দেখেছি হাজার হাজার মানুষ এক মুঠো খাবারের জন্য আর্মির গাড়ির পেছনে ছুটাছুটি করছে| আমরা ছাত্ররা সমিতি করে আর্মির বেঁচে যাওয়া খাবার সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিতরণ করতাম| ভয়ে গ্রামে যেতাম না| মানুষ খালি পেট দেখিয়ে কিছু চাইত| অনেকে সবজি খেয়ে দিন কাটাতো|

* আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা|

** আপনাকেও|

 (ছবি তুলেছেন কবি জাফর আহমদ রাশেদ) ২২.৯.২০১৪