মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্য নিদর্শন, পাবনার কাচারি জামে মসজিদ
মো. ইসলাম আলী

বাংলা জনপদটি পুণ্ড্র-বরেন্দ্র-রাঢ়-সুক্ষ্ম-গৌড়-কর্ণসুবর্ণ-তাম্রলিপ্তি-বঙ্গ-বঙ্গাল-সমতট-হরিকেল নামে পরিচিত ছিল| প্রাচীনকালে রাঢ়, সুক্ষ্ম, পুণ্ড্র, বঙ্গ স্থানের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো| পুণ্ড্র বলতে উত্তরবঙ্গ, রাঢ় বলতে মধ্য-পশ্চিমবঙ্গ, সুক্ষ্ম বলতে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গ, বঙ্গ বলতে পূর্ববঙ্গ এবং সমতট-হরিকেল বলতে পূর্ববঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলকে বোঝাতো| বর্তমানে বরেন্দ্র বলতে উত্তরবঙ্গকে বোঝায়| সপ্তম শতাব্দীতে বাংলার গৌড় অধিপতি হিসেবে প্রথম বাঙালি সার্বভৌম রাজা শশাঙ্ক গৌড়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন| তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণ| তিনি দণ্ডভুক্তি, উৎকল, কোঙ্গোদ, মগধ প্রভৃতি অঞ্চল জয়ের মাধ্যমে গৌড়ে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন| বাংলার ভূখণ্ডগত রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং সাম্রাজ্য বিস্তৃতির কারণে শশাঙ্ককে বাংলার প্রথম জাতীয় রাজা বলে অভিহিত করা হয়| রাজা শশাঙ্কের পর অষ্টম শতাব্দী থেকে বাংলার গৌড়, পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন ও বঙ্গ নামক জনপদ সমগ্র বাংলায় পরিচিতি পায়|
পুণ্ড্র প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল| প্রখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েং সাং এর ভ্রমণ কাহিনীতে পুণ্ড্র জনপদটিকে বেশ ঘনবসতিপূর্ণ বলে অভিহিত করা হয়েছে| পুণ্ড্র জাতির জনগণ উত্তরবঙ্গে বসবাস করতো বলে এ অঞ্চলের নাম ছিল পুণ্ড্র দেশ বা পুণ্ড্রবর্ধন| ভবিষ্য পুরাণে গৌড়, বরেন্দ্র, নীবিতি, সুক্ষ্ম, ঝাড়খণ্ড, বরাহভূমি ও বর্ধমান নামক সাতটি রাজ্যকে পুণ্ড্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়| পুণ্ড্র অঞ্চলের প্রাচীন জনপদের মধ্যে পাবনা জেলা অন্যতম| শিল্প, সাহিত্য, বাণিজ্য, কৃষি ও স্থাপত্যে পাবনার অবদান ব্যাপক ও বিস্তৃত| ১৮২৮ সালে রাজশাহীর একাংশ নিয়ে পাবনা জেলার সৃষ্টি হয়| পদ্মা ও যমুনার সঙ্গমস্থলে পাবনা জেলা দেশের অর্থনীতির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ| ইতিহাসবিদদের মতে পুন্ড্র হতে পাবনা, অন্যমতে পদুম্বা হতে পাবনা, ভিন্নমতে পবন জলদস্যু হতে পাবনা, এছাড়া সর্বাধিকমতে পদ্মা ও যমুনার চরাঞ্চলে প্রচুর তুলাজাত আঁশের চাষ হত| এই তুলাজাত আঁশকে ফারসিতে পমবাহ বলে| সুতরাং পমবাহ শব্দ হতে পাবনা নামকরণ হয়েছে বলে অত্যধিক স্বীকৃত|

মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণে তৈরি পাবনা শহরের কাচারি জামে মসজিদটি জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক বহন করছে| দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদে নামাজের জন্যে মনোরম আবহ বিদ্যমান| শতবর্ষী মসজিদটি মুসল্লি ও পর্যটকদের কাছে স্থাপত্যিক আগ্রহে পরিণত হয়েছে|
মসজিদের অবস্থান
পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কাচারি জামে মসজিদ অবস্থিত| মসজিদের পূর্বে জেলা পরিষদ ও পৌরসভা, পশ্চিমে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, পুলিশ লাইনস ও প্রধান ডাকঘর, উত্তরে পৌর পুকুর ও আবাসিক এলাকা, দক্ষিণে শেখ রাসেল শিশু পার্ক, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় অবস্থিত| গোপালপুর মৌজায় দাগ নং ১৫০২ ভূমির উপর মসজিদটি নির্মিত| স্বরুপ প্রামাণিক নামে এক ব্যক্তি মসজিদের জমি দান করেছিলেন বলে অনুমিত হয়|

মসজিদের নামকরণ
ইছামতি নদীকেন্দ্রিক ১৮২৮ সালে রাজশাহীর একাংশ নিয়ে পাবনা জেলার সৃষ্টি হয়| নদীর শহরাংশের পূর্ব পাড়ে স্থাপিত হয় প্রশাসনিক কেন্দ্র| প্রশাসনিক কাজ সম্প্রসারণে গড়ে উঠে কোর্ট-কাচারি, কালেক্টরেট অফিস, আদালত, জেলখানা ও ডাকঘরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান| ফলে জনশ্রুতি মোতাবেক কোর্ট-কাচারির নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ হয় কাচারিপাড়া| পাবনা শহরের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় কাচারিপাড়া| কাজেই কাচারিপাড়ার নামানুসারে ঐতিহাসিক মসজিদের নামকরণ হয় কাচারি জামে মসজিদ|
মসজিদের ইতিহাস
মসজিদের পূর্ব দিকের দেয়ালে ফারসি ভাষায় লিখিত শিলালিপি হতে জানা যায়, হারুন চাপরাশি ১৮৬৯ সালে (১২৯৬ বঙ্গাব্দ, ১৩০৬ হিজরি) মসজিদটি নির্মাণ করেন| মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত, রীতি-নীতি, আদব-কায়দা ও ধর্মীয় শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন| পরবর্তীতে পাবনার দুলাই জমিদার আজিম চৌধুরীর স্ত্রী অর্থ দান করলে মসজিদটি ইটের দেওয়াল ও পাকা ছাদ দিয়ে (টালি দ্বারা) নির্মাণ করা হয়| ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ব্রিটিশ প্রশাসন পাবনায় মুসলমানদের মধ্য হতে দু’জন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়| ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল বাছেদ চৌধুরী ১৯০৬ সালে শাহী মসজিদ (ঢাকা) এর অনুকরণে কাচারি জামে মসজিদ পূননির্মাণ করেন|

মসজিদের নির্মাণ শৈলী
মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণে কাচারি জামে মসজিদ বিভিন্ন উপাদানে নির্মিত| নির্মাণ উপকরণ হিসেবে প্রথমে বাঁশ, কাঠ ও টিন ব্যবহৃত হয়েছিল| পরবর্তীতে মসজিদটি পাকাকরণ হলে মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণে স্থাপত্যিক পরিবর্তন ঘটে| অর্ধবৃত্তাকার রোমান খিলান ও খড়খড়ির ব্যবহার, কারুকার্য খচিত মিনারের সিঁড়ি, ফ্যান লাইটযুক্ত দুই কপাটের দরজা-জানালা, ছাদে ঢেউ পলেস্তারা ও লোহার বিমের ব্যবহার এবং ফুল ও লতাপাতার নকশার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়| এছাড়া, বহির্দেয়ালে করিন্থিয় রীতির পোস্তা, ভেনেসীয় জানালা, খিলানপটে ফ্যানলাইট সংযোজন, খিলানপটে নকশার ব্যবহার, গ্রিলে আল্লাহ ও মুহাম্মদ (সা.) নাম সংবলিত রডের ব্যবহার, ইট, চুন, সুরকি, লোহা, কাঠ, মোজাইক, শ্বেত পাথর ও মার্বেল পাথরের ব্যবহার হয়েছে| অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজে চীনা মাটির খণ্ডিত অংশ ব্যবহৃত হয়েছে| বর্তমানে মসজিদটিতে টাইলসের ব্যবহার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র সংযোজিত হয়েছে|
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট
কাচারি জামে মসজিদ মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত| যথা- মূল মসজিদ, মধ্যবর্তী অংশ ও বারান্দা অংশ| মূল মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৬৭ ফুট ৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ১৪ ফুট ৮ ইঞ্চি, উচ্চতা ২৫ ফুট ৩ ইঞ্চি ও দেওয়ালের পুরুত্ব ছিল ২ ফুট| মূল মসজিদটিতে তিনটি কাতার বিদ্যমান আছে| মধ্যবর্তী অংশে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৬৭ ফুট ৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ২০ ফুট ৮ ইঞ্চি, উচ্চতা ১৫ ফুট ৩ ইঞ্চি ও দেওয়ালের পুরুত্ব ছিল ২ ফুট| মধ্যবর্তী অংশে মসজিদটিতে পাঁচটি কাতার বিদ্যমান আছে| বারান্দা অংশে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৬৩ ফুট ৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ২০ ফুট ৮ ইঞ্চি, উচ্চতা ১৫ ফুট ৩ ইঞ্চি ও দেওয়ালের পুরুত্ব ছিল ২ ইঞ্চি| প্রতিটি দরজা ও জানালায় অর্ধবৃত্তাকার খিলানের ব্যবহার হয়েছে| খিলানের শীর্ষদেশ পর্যন্ত উচ্চতা ১০ ফুট ৫ ইঞ্চি| প্রতিটি দরজা ও জানালার উচ্চতা ৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ৫ ফুট, প্রস্থ ৪ ফুট| মূল মসজিদটির উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালের মাঝখানে দুটি অর্ধবৃত্তাকার খিলানের জানালা রয়েছে যার দৈর্ঘ্য ৭ ফুট ২ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০ ফুট ২ ইঞ্চি|
মসজিদের প্রবেশপথ
মসজিদটির মধ্যবর্তী অংশের উত্তর দিকে মূল প্রবেশপথ অবস্থিত| পূর্ব দিকে বারান্দা অংশের উত্তর ও দক্ষিণ দিক দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা যায়| পূর্ব দিকে পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার খিলান সংবলিত অষ্টকোণাকৃতি স্তম্ভের উপর নির্মিত প্রবেশপথ রয়েছে| ভূমি হতে খিলানের শীর্ষদেশের উচ্চতা ৯ ফুট ৬ ইঞ্চি| খিলানের শীর্ষদেশ হতে পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার খিলান ছাদ স্পর্শ করেছে| ফলে দুই স্তরের খিলানের সৃষ্টি হয়েছে| এতে মসজিদে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করে| সম্প্রতি পূর্ব দিকে মসজিদটি সম্প্রসারিত হয়েছে|
বারান্দা
মসজিদের পূর্ব দিকে প্রবেশমুখে বর্ধিত বারান্দা অবস্থিত| বারান্দা উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ৬৩ ফুট ৫ ইঞ্চি, পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্থ ২০ ফুট ৮ ইঞ্চি| বারান্দায় বর্তমানে অতিরিক্ত পাঁচটি কাতার সংযোজিত হয়েছে| মসজিদটির পূর্ব দিকে বারান্দা-সংলগ্ন ওযুখানা ও পূর্ব-উত্তর কোণায় শৌচাগার আছে| বারান্দার পূর্ব দিকের শেষ প্রান্তে করিন্থিয় রীতির পাঁচটি স্তম্ভ ব্যবহৃত হয়েছে|
জুল্লাহ
মসজিদটি জুল্লাহ সংবলিত ঢেউ তোলা ছাদ নির্মিত| মসজিদের অভ্যন্তরে নির্মল বাতাস প্রবেশ ও কক্ষ ঠাণ্ডা রাখতে চার দেওয়ালের উর্দ্ধাংশে আয়তকার ও গোলাকার বায়ুরন্ধ্র ব্যবহার করা হয়েছে| কিবলা দেয়ালে একুশটি, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে এবং পূর্ব দেয়ালে ছয়টি আয়তকার ও গোলাকার বায়ুরন্ধ্র ব্যবহৃত হয়েছে| বহির্ভাগে প্রতিটি বায়ুরন্ধ্রে জ্যামিতিক নকশার লোহার জালি ব্যবহৃত হয়েছে| জালিতে দৃষ্টিনন্দন লতাপাতার নকশা ব্যবহৃত হয়েছে| কিবলা দেয়ালের উর্দ্ধাংশে ২ ফুট ৬ ইঞ্চি বর্গাকৃতি দুটি জানালা রয়েছে| জানালার গ্রিলে আল্লাহ ও মুহাম্মদ (সা.) নাম সংবলিত রডের ব্যবহার হয়েছে|
মিহরাব
মিহরাবটি বহুভাঁজ বিশিষ্ট খিলানে আয়তাকার কাঠমোতে নির্মিত| খাঁজ খিলানটির নকশা মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে| মিহরাবের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে অর্ধবৃত্তাকার খিলান সংবলিত প্রবেশপথ বিদ্যমান| উত্তর ও দক্ষিণে দুটি প্রবেশপথের দৈর্ঘ্য ১ ফুট ৮ ইঞ্চি, প্রস্থ ৭ ফুট ৫ ইঞ্চি| উত্তর ও দক্ষিণে অর্ধবৃত্তাকার প্যানেল আছে যা বই রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়| পশ্চিমের প্রবেশপথের দৈর্ঘ্য ২ ফুট ১ ইঞ্চি, প্রস্থ ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি| পশ্চিমের প্রবেশপথের সাথে একটি কক্ষ আছে| কক্ষটির তিনদিকে খোলা এবং জানাজার সময় এখানে মৃতদেহ রাখা হয়| এ কক্ষের উপর বহুভাঁজ বিশিষ্ট একটি গম্বুজ আছে| ইউরোপীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণে এটি দেখতে দৃষ্টিনন্দন|
ছাদ
কাচারি জামে মসজিদের মূল অংশ ঢেউ খেলানো ছাদ স্থাপত্যে নির্মিত| ছাদ নির্মাণে বিশেষ কৌশল হিসেবে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি লোহার বীম হতে ইটগুলো পর্যায়ক্রমে স্থাপন ও চুন-সুরকি ব্যবহার করে ছাদ ˆতরি করা হয়েছে| ফলে ছাদ মজবুত ও শক্তিশালী হয়েছে| এ পদ্ধতিতে ছাদের চাপ নিম্নমুখী না হয়ে পাশে স্থানান্তরিত হয় এবং ছাদ স্থায়িত্ব লাভ করে| এতে লোহার ১৪টি বিম হতে ১৫টি ঢেউ খেলানো ছাদ জুল্লাহ হিসেবে নির্মিত হয়েছে|
পোস্তা
মসজিদের ভারবহন, স্থায়িত্ব ও প্রাচীর সুদৃঢ়করণে পোস্তা ব্যবহৃত হয়| কাচারি জামে মসজিদের পশ্চিম বহির্দেয়ালে ছয়টি, গম্বুজ কক্ষের বহির্দেয়ালে চারটি, উত্তর ও দক্ষিণ বহির্দেয়ালে দুটি করে মোট চৌদ্দটি পোস্তা করিন্থিয় স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত| পোস্তাগুলো নীচ হতে উপর পর্যন্ত ক্রমশ সরু| এগুলো লম্বালিম্বি এবং শীর্ষদেশ লতাপাতার নকশা দ্বারা সজ্জিত যা মসজিদের সৌন্দর্য নান্দনিক করেছে|
গম্বুজ
স্থাপত্যিক নিদর্শন গম্বুজের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে| কিবলা দেওয়ালের ছাদের উপর তিনটি বড় আকৃতির গম্বুজ নির্মিত হয়েছে| মিহরাবের ঠিক উপরে মধ্যবর্তী গম্বুজ এবং উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে লাগানো দুটি গম্বুজ নির্মিত হয়েছে| উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে কক্ষের উপর নির্মিত হয়েছে বৃহদাকার দুটি গম্বুজ| উভয় কক্ষের দৈর্ঘ্য ৮ ফুট ৯ ইঞ্চি, প্রস্থ ৫ ফুট ২ ইঞ্চি| প্রতি কক্ষে তিনটি করে জানালা ও একটি দরজা আছে| উত্তর প্রান্তের কক্ষে মসজিদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হয় এবং দক্ষিণ প্রান্তের কক্ষে ইমাম সাহেব অবস্থান করেন| মিহরাবের ঠিক উপরে মধ্যবর্তী গম্বুজ কলস সংবলিত তারকা খচিত নকশায় সুশোভিত এবং উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের গম্বুজ কলস সংবলিত অর্ধচন্দ্রাকারে নির্মিত| এছাড়া মসজিদের চার কোণায় ছাদের কিনারায় চারটি বহুভাঁজ বিশিষ্ট ছোট গম্বুজ নির্মিত হয়েছে| সর্বোপরি পশ্চিম ছাদে দশটি বড় ও দুটি ছোট, পূর্ব ছাদে ছয়টি, দক্ষিণ ছাদে দুটি, উত্তর ছাদে দুটি ও চার কোণায় চারটিসহ মোট ছাব্বিশটি গম্বুজ শোভা পাচ্ছে| উল্লেখ্য, সবগুলো গম্বুজ মসজিদের মূল অংশে নির্মিত হয়েছে|
মিনার
বাংলাদেশে দৃষ্টিনন্দন মিনারের মধ্যে পাবনার কাচারি জামে মসজিদের মিনার অন্যতম| সুউচ্চ মিনারটি মুসলিম আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে| আকর্ষণীয় মিনারটি উত্তর দিকে অবস্থিত| চারটি পিলারের উপর নির্মিত মিনারটি গোলাকার এবং নীচ হতে উপরের দিকে ক্রমশ ঢালু| সাত তলা বিশিষ্ট মিনারের উচ্চতা ৭০ ফুট এবং নীচের দিকে ব্যস ১০ ফুট| মিনারটির শীর্ষদেশে পৌছুঁতে ৪৮টি পেঁচালো সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়| মিনারটির শীর্ষদেশের গম্বুজ কলস সংবলিত অর্ধচন্দ্রাকারে নির্মিত| আজানের জন্যে গম্বুজের চারদিকে মাইক ব্যবহৃত হয়| পারসিক স্থাপত্যের গোলাকার মিনারের আদলে এটি নির্মিত হয়|
মুসল্লি
পাবনার বৃহৎ জমায়েতের সুবিধা সংবলিত মসজিদের মধ্যে এটি অন্যতম| প্রায় ১৫০০ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে এখানে| সাধারণত কাচারিপাড়া, জেলাপাড়া, পাথরতলা ও জেলা পরিষদ, পৌরসভা, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, পুলিশ লাইনস, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আসা জনসাধারণ এখানে নামাজ আদায় করে থাকেন|
প্রশাসনিক ব্যবস্থা
জেলা প্রশাসক, পাবনা পদাধিকারবলে মসজিদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন| তবে স্থানীয় জনসাধারণ হতে নির্বাহী কমিটির সদস্য মনোনীত করে মসজিদটি পরিচালনা করা হয়| দুজন ইমাম (একজন ওয়াক্ত নামাজ ও অন্যজন পেশ ইমাম), একজন মুয়াজ্জিন ও একজন খাদেম মসজিদের সেবা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করে থাকেন|
পরিশেষে বলা যায়, মুঘল, ইউরোপীয় ও পারসিক স্থাপত্যের সংমিশ্রণে তৈরি মসজিদটি আমাদের তৎকালীন উন্নত সভ্যতার স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়|
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ| বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা|