হোম » ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত দেশের প্রথম মানমন্দির

ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত দেশের প্রথম মানমন্দির

শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী

শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী
শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী

মন্দিরের সঙ্গে পরিচিত হলেও মানমন্দিরের সঙ্গে আমরা খুব একটা পরিচিত নই। মানমন্দির হলো মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, যেখানে বসে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দুরবিন দিয়ে নিখুঁতভাবে আকাশ নিরীক্ষণসহ যাবতীয় গাণিতিক হিসাব-নিকাস এবং নভোবস্তুর আলোকচিত্র গ্রহণ করে থাকেন। সাধারণত একটি মানমন্দির স্থাপনের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার মিটার উঁচু পর্বতচূড়া বেছে নেওয়া হয়, যেন ওই স্থান থেকে আকাশের বৃহত্তম দিগন্তরেখা দেখা যায়। শুধু আধুনিক যুগেই নয়, প্রাচীন যুগেও মানমন্দির স্থাপিত হয়েছিল।

     সৌরজগতের অষ্টম গ্রহ নেপচুন আবিষ্কারের কৃতিত্ব জার্মানির বার্লিন মানমন্দিরের। মানমন্দিরটি স্থাপিত হয় ১৭০০ সালে। একই সময়ে আবার স্থাপিত হয় প্রুশিয়ান বিজ্ঞান একাডেমিও। মানমন্দির স্থাপনের পেছনে প্রুশিয়ান রাজা এবং বিজ্ঞান একাডেমির বিরাট অবদান রয়েছে। একাডেমির প্রথম সভাপতি ছিলেন বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ গডফ্রিড লিবনিজ। মজার ব্যাপার হলো, একসময় একাডেমির নিজস্ব কোনো মানমন্দির ছিল না। ছিলেন গডফ্রিড কির্চ নামের একজন পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ধূমকেতু আবিষ্কারক হিসেবে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। তিনি আবার রাজজ্যোতির্বিজ্ঞানীও ছিলেন। তবে রাজার শর্ত ছিল, সপ্তাহের দুই রাত জনসাধারণের জন্য মানমন্দির উন্মুক্ত থাকবে। 

     ধূমকেতু আবিষ্কারকদের মধ্যে সবাই যে পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন তা নয়। এঁদের মধ্যে অনেকেই আছেন শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী। এঁরা ধূমকেতু ও গ্রহাণু আবিষ্কার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। এমনি একজন শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাঁ লুই পন্স। তিনি ২৬ বছর বয়সে মারসেলজ মানমন্দিরের সামান্য দ্বাররক্ষক হিসেবে কাজ পান। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। পরবর্তীকালে তিনি আবিষ্কার করেন ৩৭টি ধূমকেতু। ১৮১৯ সালে তিনি ইতালির লুক্কা নগরের মানমন্দিরের অধ্যক্ষের পদ লাভ করেন।

     আমাদের দেশে কোনো পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী নেই। নেই কোনো আবিষ্কারক। ইউরোপে যেখানে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীই ডজনখানেক ধূমকেতু আবিষ্কার করেন, সেখানে আমাদের কোনো কৃতিত্ব নেই।

     প্রসঙ্গক্রমে ‘লিক মানমন্দির’-এর কথা বলা যায়।  মানমন্দিরের জন্য বিরাট অংকের অনুদান দিয়েছিলেন জেমস লিক নামের একজন মার্কিন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তাঁর নামেই মানমন্দিরটির নামকরণ হয়। বর্তমানে এটি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত। বৃহস্পতি গ্রহের পঞ্চম চাঁদ অ্যামালথিয়া আবিষ্কারের কৃতিত্ব এই মানমন্দিরের। মানমন্দিরটি স্থাপিত হয় ১৮৮৮ সালে। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের হ্যামিলটন পর্বতের ওপর এটি অবস্থিত।

     দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে আজ অবধি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চা তথা গবেষণার জন্য কোনো মানমন্দির স্থাপিত হয়নি। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীকদের জন্য রয়েছে সুখবর। গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছে একটি মানমন্দির, যা ‘বেনুভিটা অ্যাস্ট্রো অবজারভেটরি’ নামে পরিচিত। অবজারভেটরির বাংলা প্রতিশব্দ মানমন্দির। এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান ক্লাব অনুসন্ধিৎসু চক্রের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি শাহজাহান মৃধা বেনু। দেশে যে কয়েকজন বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তির হাত ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চা শুরু হয়েছিল তাদের মধ্যে শাহজাহান মৃধা বেনু অন্যতম। কিশোর বয়স থেকেই পরিবেশের একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক ছিলেন তিনি। উদ্ভিদবিষয়ক অন্যতম সাময়িকী ‘প্রকৃতিপত্র’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স এবং বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

     ১৯৯০ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের ছাদে একটি মানমন্দির স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন শাহজাহান মৃধা বেনু। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি নির্মাণ করেন মানমন্দিরটি। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ছাদের ওপর কাজ করতে গিয়ে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় তাঁকে। নির্মাণের পর যথাযথ দেখা শোনার অভাবে কিছু দিনের মধ্যেই সেটি অকেজ হয়ে পড়ে। পরে ঢাকার বেইলি রোডের নিজের বাড়ির ছাদে আরেকটি দুরবিন তথা মানমন্দির স্থাপন করেন তিনি। কিন্তু বাড়ির চারপাশে আকাশচুম্বী সব ভবন নির্মাণ হওয়ায় পরবর্তীকালে দুরবিন দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পরে। এর সঙ্গে আলোক দূষণ তো ছিলই।

     বর্তমান বেনুভিটা মানমন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। গাজীপুরের ভাওয়াল গড় তথা বনাঞ্চলের ঘন সবুজ শালবন বেষ্টিত প্রায় ৮০ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত হয়েছে এই দৃষ্টিনন্দন মানমন্দিরটি। এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে নির্মিত দেশের প্রথম মানমন্দির। বিপুল অর্থ ও শ্রম দিয়ে তিলেতিলে গড়ে তোলেন এটি। এখানে রয়েছে ডরমেটরি, অ্যাস্ট্রো উঠান এবং সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার এক অনন্য স্থাপনা। মানমন্দিরের আঙিনাসহ পুরো ভবনের নকশা করা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুর আদলে। চারতলাবিশিষ্ট ভবনের ওপরের ছাদে বসানো হয়েছে দুরবিন। ছোট বড় মিলে মোট ১০টি দুরবিন রাখা হয়েছে এখানে। ছোট দুরবিনটির ব্যাস ৪ ইঞ্চি এবং বড়টির ব্যাস ১৪ ইঞ্চি (মিড ক্যাসিগ্রেন টেলিস্কোপ)। এগুলোর মধ্যে আবার সৌর বা সোলার দুরবিন রয়েছে দুটি। সেগুলো দিয়ে দিনের বেলায় ‘সৌরকলঙ্ক’ পর্যবেক্ষণ করা হয়।

     গাজীপুরের ভাওয়াল গড় হলো একটি বিশাল বনাঞ্চল। এখানে রয়েছে ‘ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান’। এই বন প্রধানত শালগাছের বনভূমি, যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণী রয়েছে। প্রায় ১২,৪০৯ একর জায়গা জুড়ে ভাওয়াল উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। এ উদ্যান মূলত ক্রান্তীয় পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি। যার আয়তন প্রায় ২৫৯ বর্গ কিলোমিটার।

     বিংশ শতকের প্রথম দিকে একটি বিখ্যাত মামলা হয়েছিল ভাওয়ালের জমিদার বংশের রাজকুমারকে ঘিরে। এটি আবার ভাওয়ালের সন্ন্যাসী মামলা নামে খ্যাত। এই জমিদার বাড়ির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনীত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ নামের বাংলা ছবিটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্যে  আবু জাফর শামসুদ্দীন রচিত ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ শীর্ষক একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস রয়েছে।

     বেনুভিটা মানমন্দিরে যেতে হলে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাঘের বাজার নেমে অটোরিক্সা ও পায়ে হেঁটে গহীন গজারি বনের ভেতর দিয়ে পাড়ি দিতে হবে দুর্গম পথ। ভিটাটি রাজাবাড়ি ইউনিয়নের বিন্দুবাড়ি গ্রামে অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বেনু মিয়ার প্রজেক্ট’ হিসেবে পরিচিত।

     প্রকৃতির এক অপূর্ব লিলাভূমি এই গজারি বন। সেখানে দাড়িয়ে আছে হাজার হাজার গজারিগাছ। লাল মাটির পাহাড় ও টিলার মাঝে মাঝে ছোট ছোট রাস্তা আপনাকে নিয়ে যাবে গহীন অরণ্যে। মনে হবে যেন দু’পাশের সবুজ গাছপালা মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। প্রায় ৩০ হাজার একরের বেশি জায়গায় নিয়ে বিস্তৃতি এই গজারি বন। যেখানে রয়েছে নানা প্রকারের বন্য প্রাণী। এমনই একটি প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতরে মানমন্দিরটি স্থাপিত হয়েছে, যা আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য উপযুক্তই বলা যায়।

বেনুভিটা মানমন্দিরে `অ্যাস্ট্রো আড্ডা’র একটি মুহূর্ত

     প্রতিষ্ঠাতা শাহজাহান মৃধা বেনুর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এই মানমন্দির। তাঁর স্বপ্ন ছিল দেশে এমন একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন, যেখানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীরা উন্নত বিশ্বের মতো পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবেন। স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা হচ্ছে মানমন্দিরটি। চাইলেই যে কেউ নিজেদের দলবল নিয়ে এসে এখানে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। গবেষকদের জন্য অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফিসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, গ্রন্থাগার ও থাকার সুব্যবস্থা করা হচ্ছে। আয়োজন করা হচ্ছে সেমিনার ও কর্মশালা। মানমন্দির প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয়েছে আনন্দধারা নামে একটি বিদ্যালয়। একটি মানুষ জ্ঞানচর্চায় কতটা শৌখিন হলে এমন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ ঘটাতে পারেন! তা-ও আবার নিজ উদ্যোগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো ব্যয়বহুল কর্মকাণ্ডেএর উদাহরণ শাহজাহান মৃধা বেনু। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পপতি ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকও বটে।

     ইতিমধ্যে মানমন্দিরটি পরিদর্শন করেছেন নাসার সাবেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজের পদার্থ ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক ড. দীপেন ভট্টাচার্য, মহাকাশ গবেষক ড. মাকসুদা আফরোজ এবং ইউএস নেভাল মানমন্দিরের সাবেক গবেষক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন।

     মূল কর্মকাণ্ড ছাড়াও বছরের (১৪ জানুয়ারি ২০২৫) প্রথম পূর্ণিমা উদ্যাপন করেছে বেনুভিটা মানমন্দির, যা ‘চন্দ্রোৎসব’ নামে পরিচিত। রোমাঞ্চপ্রিয় ও প্রকৃতিপ্রেমীকদের কাছে উৎসবটি ছিল বেশ উপভোগ্য। অনুষ্ঠানের শুরুতে ছিল যন্ত্রসংগীত। সন্ধ্যায় চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের মধ্য দিয়ে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়। উদ্বোধনী বক্তব্যর পর চলে পুঁথিপাঠ ও পিঠাপুলির আয়োজন। এ সময় পরিবেশন করা হয় জলতরঙ্গ। পাশাপাশি চন্দ্রবিষয়ক তথ্যচিত্র প্রদর্শনীসহ দুরবিন দিয়ে পূর্ণ চাঁদ, গ্রহ ও উপগ্রহ দেখানো হয়। আয়োজনের আরেকটি দিক ছিল আলোকিত ঘুড়ি ওড়ান, বাউলগান, মিউজিক থেরাপি ও বনাঞ্চল পরিদর্শন। কেউ কেউ মানমন্দির চত্বরে ফেলা তাঁবুতে শুয়ে উপভোগ করেন জ্যোৎস্না রাত। আর গানে গানে মেতে ওঠেন,

 চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে, উছলে পড়ে আলো

ও রজনীগন্ধা, তোমার গন্ধসুধা ঢালো…।

 বাঁশি, দোতারাসহ লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সুরে সুরে চন্দ্রোৎসব উপভোগ করেন আগত পূর্ণিমাবিলাসী মানুষ। শুধু চন্দ্র দেখাই নয়, আয়োজনটি ছিল প্রকৃতির সঙ্গে বিজ্ঞানের এক মেলবন্ধন।

এই মানমন্দির ঘিরে শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি দেশে একদিন পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী তৈরি হবে। দেশে একটি বড় পরিসরের দুরবিন স্থাপিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় খোলা হবে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ ও নিজেস্ব মানমন্দির। প্রসার ঘটবে জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার। আবিষ্কার হবে নতুন কোনো নভোবস্তু। এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

 লেখক : শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী; বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক; ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জামাল নজরুল ইসলাম গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *