মুশতারী বেগম ডলির জীবনের গল্প
মুহাম্মদ শামসুল হক

শৈশবের দিনগুলো ছিল তাঁর বৈচিত্রে ভরা, সাধারণ শিশুদের চাইতে আলাদা। দাদির আগ্রহে বাবা করলেন দ্বিতীয় বিয়ে। ফলে বিমাতা ও বাড়ির পরিচারকের হাতেই তাঁর লালিত-পালিত হওয়া ও বেড়ে ওঠা। শিশুকালটা বিচিত্র অভিজ্ঞতাপূর্ণ হলেও তেমন সুখের ও আনন্দময় ছিল না। নানা কারণে পড়ালেখায়ও মাধ্যমিক ডিঙাতে পারেননি। অথচ গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী, প্রবন্ধ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়কসহ গ্রন্থ লিখেছেন ২২টি। লিখেছেন নাটক, জীবন্তিকাসহ বহু প্রবন্ধ নিবন্ধ। সম্মাননা পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন প্রায় চার ডজন। ফরিদপুর জেলার গেরদা গ্রামে পৈত্রিক বাড়ি হলেও জন্মেছিলেন ভারতের মালদহ জেলার কালিয়াচক থানায় ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। কিশোর বয়স থেকেই তিতু হয়েছেন চট্টগ্রাম শহরে। বলছিলাম মোছাম্মত উম্মে কুলসুম ওরফে ডলি আপার কথা। যে ডলি আপা পরবর্তী সময়ে কিংবদন্তীতুল্য সম্মানিত, সাহসী, প্রতিবাদী কলম ও শব্দসৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান নিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন এ বছর বিজয়ের মাসে। তিনি আমাদের শহীদজায়া, মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফি।

মুশতারী শফীর বাবা ফরিদপুর জেলার গেরদা গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার নজমুল হক আনসারী ছিলেন ব্রিটিশ যুগের সরকারি কর্মকর্তা—ডেপুটি পুলিশ সুপার (ডিএসপি)। দাদা খন্দকার হেলাল উদ্দিন ছিলেন সাব রেজিস্ট্রার। মায়ের নাম আরেফা খাতুন। নানার বাড়ি খুলনা জেলার কশবা উপজেলাধীন পায়গ্রাম। নানা খান বাহাদুর কাজী আজিজুল হক ছিলেন অবিভক্ত ভারতের পুলিশ সুপার এবং ফিঙ্গার প্রিন্ট আবিষ্কারক (১৯৩৩)। চাকরির কারণে তাঁর বাবাকে বিভিন্ন জেলা বা থানা এলাকায় থাকতে হয়েছে পরিবার নিয়ে। ১৯৩৮ সালে তাঁর চাকরিস্থল ছিল ভারতের মালদহ জেলায়। থাকতেন জেলার কালিয়াচক থানায়। সেখানেই ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্ম নেন মুশতারী। খন্দকার নজমুল হক আনসারী তাঁর মেয়ের নাম রেখেছিলেন অনেক দীর্ঘ-মোছাম্মাত উম্মে কুলসুম মুশতারী বেগম ওরফে ডলি। বিয়ের পর স্বামী ডা. মোহাম্মদ শফীর নামের শেষাংশ যুক্ত হয়ে তাঁর নাম হয় বেগম মুশতারী শফী।
বাবার বদলিজনিত কারণে অনেক বিদ্যালয়ে পড়তে হয়েছে মুশতারী শফীকে। সর্বশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ঢাকার কামরুন্নেসা গালর্স হাইস্কুল। মাত্র তিন মাস বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। ১০ বছর বয়সে বাবার অকাল মৃত্যু হয়। এসময় তাঁর লেখাপড়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। জীবনের ওপর নেমে আসে নানা বিপর্যয়। শিক্ষিত অভিজাত পরিবারে জন্ম হলেও আত্মীয়-স্বজনেরা পিতৃ-মাতৃহীন ডলির লেখাপড়ার পেছনে খরচ করাটা অপচয় মনে করতেন। সে যুগে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া কর্তব্য মনে করতেন আত্মীয়-অভিভাবকেরা। তাঁরা কৈশোরেই মাত্র ১৫ বছর বয়সে (১৯৫৪ সালের ১৬ জানুয়ারি) বিয়ে দিয়ে দেন মুশতারীকে। কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ আর হয়নি তাঁর। তাঁর বড় বোনদের বিয়ে হয়েছে আরও কম বয়সে, ১২-১৩তে। তাঁর স্বামী মোহাম্মদ সফী ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের হুগলী জেলার তারেকশ্বর এলাকার বাসিন্দা। কর্মসূত্রে ছিলেন চট্টগ্রাম কারাগারের ডেন্টাল সার্জন। মুশতারী শফীর এক ভগ্নিপতি ছিলেন চট্টগ্রামের কাস্টমস কর্মকর্তা। বিয়ের আগে মুশতারী থাকতেন ভগ্নিপতিদের বাসায়। সেখান থেকেই অভিভাবকদের পছন্দে ডা. সফীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
শৈশব থেকে পুরো জীবনটাই নানা বৈচিত্রপূর্ণ ঘটনায় ভরপুর ছিল মুশতারী শফীর। চরিত্রগত দিক থেকে তিনি ছিলেন কিছুটা শান্ত আবার কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির। ছিলেন কৌতুহলী এবং অভিমানীও। তাঁর বাবা ছিলেন অভিনয় শিল্পী-সংগীত অনুরাগী। মুশতারীরও সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটকাল থেকে। কিন্তু বাবার অকাল মৃত্যু তাঁর সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা অনেকটা পিছিয়ে দেয়। এরই মধ্যে তিনি দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। এসব কিছু তাঁর মনে রেখাপাত করে। তাঁর মধ্যে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয় ধৈর্য সহনশীলতা, সৃজনশীলতা ও দেশাত্মবোধ। পরিণত বয়সে যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই।
স্মৃতির জানালায় উঁকি দিয়ে একের পর এক সেসব ঘটনার গল্প বলে যাচ্ছিলেন তিনি সাক্ষাৎকারে। বলছিলেন সবটা পুরোপুরি মনে নেই। যেটুকু মনে আছে তার কয়েকটি শুনেই বোঝা গেল শৈশবকালীন কতটুকু চঞ্চল ও অভিমানী ছিলেন। গল্পগুলো এরকম- বেগম মুশতারী শফী ছোটকালে অনেক রকম দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছেন। খুব ছোটবেলায় তিনি যখন মালদহ জেলার ইংরেজ বাজার এলাকায় ছিলেন তখন তাঁর এক চাচাত ভাই তাঁকে আদর করে নিয়ে যান স্থানীয় খেলার মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে। খেলার কিছুই বুঝতেন না তিনি। এমনিতে ভাইয়ের পাশে গ্যালারিতে বসে বাদাম খাচ্ছিলেন আর খেলা দেখছিলেন। হঠাৎ বল এসে পড়ল তাঁর নাকের ওপর। নাক ফেটে এমন রক্ত বের হতে লাগল যে, রক্তে শরীর ভেসে গেল। এতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। পরে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছিলেন।
আরেকবার মুশতারী আপাদের পার্ক-সার্কাস এলাকার বাসার উঠোনে আমসত্ত্ব শুকোতে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় ছাদে বসে রান্নাবাড়ি খেলছিলেন তিনি। ওদিকে সেই আমসত্ত্বের ওপর বসেছিল কাক। তাঁর বড় বোন তা দেখে কাকের দিকে লোহার ফুকনি ছুড়ে মেরেছিলেন। কিন্তু সেই ফুকনি কাকের গায়ে লাগেনি। লেগেছিল অদূরে ‘রান্না বাড়ি’ খেলায় রত ডলির নাকের ওপরে। ব্যস, আবার সেই রক্তারক্তি কাণ্ড। সেবার তাঁকে হাসপাতাল পর্যন্ত নিতে হয়েছিল। আরেকবার ১৯৪৪ সালের ঘটনা। কলকাতায় মুশতারীর বড় বোনের বিয়ে উপলক্ষে বাড়ি ভর্তি লোক। আত্মীয়-স্বজনেরা এসেছেন দেশ-গ্রাম থেকে। গায়ে-হলুদের আয়োজন নিয়ে সবাই ব্যস্ত। ওদিকে মুশতারী আপন মনে শোয়ার ঘরে খাটের সাথে ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক বেডসুইচ নিয়ে খেলছিলেন আপন মনে। খেলতে খেলতে এক পর্যায়ে খুলে ফেলেন সুইচের ওপরের ঢাকনা। ভেতরে পিতলের ছোট্ট একটা জিনিস দেখতে পেয়ে কৌতূহলে ওটা টেনে বের করার জন্য যেই টেনে ধরেছেন অমনি ওটাই তাঁকে টেনে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরে এলে মনে হলো অনেক রাত। চারদিক অন্ধকার। হারিকেন ও মোমের আলো জ্বলছে। তাঁর পাশে সারিবদ্ধভাবে শুয়ে আছে আরও তিনজন। মুশতারী আপাকে বেডসুইচ থেকে ছাড়াতে গিয়ে ওরাও তাঁর সঙ্গে আটকে গিয়েছিল। আর স্থানীয় ইলেকট্রনিক ট্রান্সফরমার জ্বলে গিয়ে পুরো পার্ক-সার্কাস এলাকা দুই রাত আঁধারে ডুবে ছিল। এছাড়াও পুকুরে সাঁতার শিখতে গিয়ে একবার ডুবে তলিয়ে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। ঘাটে থাকা চাচা উদ্ধার করেন সেই দুর্ঘটনার হাত থেকে।
এমন গল্পের এখানেই শেষ নয়। তিনি যে বিশেষ করে কতটা অভিমানী ছিলেন তার প্রমাণ মেলে তাঁর আত্মহত্যার চেষ্টার মধ্যে। সেবার কোনো একটা বিষয়ে বাবার সামান্য কথায় মনোকষ্ট পেয়েছিলেন মুশতারী আপা। তাই বাবার ওপর অভিমান করে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সন্ধ্যার পর বাড়ির পেছনে ঝাঁকড়া গাবগাছের ওপর উঠে বসেন। কারণ সবার কাছে তখন শুনতেন ওই গাছে অনেক ভূত-পেতনি বাস করে। ভূত-পেত্নিরা একা কাউকে কাছে পেলে ধরে মেরে ফেলে। মুশতারী আপারও মনে হয়েছিল তাদের হাতে মৃত্যুটা খুব সহজ ও আরামদায়ক হবে। তাই তিনি সেই গাবগাছে উঠে পড়েছিলেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পরও ভূত-পেত্নির দেখা পেলেন না। বাড়ির কেউ একজন তাঁকে গাব গাছে দেখে ডাকাডাকি করে নামিয়ে আনেন। এসব ঘটনা খুব মজা করে বলতেন তিনি নাতি-নাতনিদের।
বাংলা ভাষা ও দেশের প্রতি টান ছিল তাঁর স্কুলবেলা থেকে। তার প্রমাণ আমরা পাই বায়ান্নর ভাষার দাবিতে মিছিলে তাঁর অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। সেটি ছিল তাঁর জীবনে প্রথম মিছিলে যাওয়া। সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে মুশতারী শফী বললেন, ‘খুব আনন্দ ও গর্ব বোধ করি সেদিন মিছিলে অংশ নিতে পেরে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি, যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি করে হত্যা করল সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা ছেলেদের। সেদিন পুরো ঢাকা শহর প্রতিবাদ মিছিলে উত্তাল হয়েছিল- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবির সাথে ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ দাবিতে। তখন আমি ছিলাম ঢাকায় কামরুন্নেসা স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। মিছিল একটার পর একটা হাটখোলা রোড হয়ে অভয় দাশ লেনে স্কুলের কাছাকাছি আসতেই ওপরের ক্লাসের ছাত্রীরা তালাবদ্ধ ফটক টপকে বেরিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের সাথে আমার ক্লাসের যে কজন ছাত্রী বের হতে পেরেছিল তার মধ্যে আমিও ছিলাম। ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’, ‘নূরুল আমিনের ফাঁসি চাই’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সে-ই আমার প্রথম স্লোগান, প্রথম মিছিলে যাওয়া। এ জন্য মুরুব্বিদের কাছে অনেক বকা খেতে হয়েছিল এবং শাস্তিস্বরূপ ১৫ দিন স্কুলে যাওয়া আমার বন্ধ করা হয়েছিল।’
সেই ৩০-৪০ দশকের সমাজব্যবস্থায় রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়েদের জীবনে তারুণ্যটা কেমন হতে পারে সহজেই অনুমান করা যায়। তবুও জানতে চেয়েছিলাম কেমন কেটেছিল সময়টা? যাত্রা, চলচ্চিত্র, নাটক, বই পড়া ইত্যাদির প্রতি কেমন ছিল অনুরাগ? সেসব প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছিলেন এভাবে-‘আমার তারুণ্যের সময়টা তো একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে তাদের লালন পালনের যুদ্ধের মধ্য দিয়েই কেটে গেছে। বুঝতেই পারিনি জীবনে কখন তারুণ্য এলো আর গেল। সে সময় মেয়েদের খুব কম বয়সে বিয়ে হতো বিশেষ করে মুসলিম পরিবারের মেয়েদের। আমার বড় বোনদের বিয়ে হয়েছে ১২-১৩তে। সে হিসেবে আমার তো একটু বয়স হয়েছিল—১৫। যা হোক, তারুণ্যে পা দিয়ে আজকের দিনের ছেলেমেয়েরা যে স্বপ্ন দেখে, সেই স্বপ্ন দেখার সুযোগ আমি পাইনি।
যাত্রা চলচ্চিত্র নাটক আমাদের যুগে দেখার তো প্রশ্নই ছিল না। দেখেছি বিয়ের পরে। আমার স্বামী এসব ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। তাঁর সাথেই অনেক চলচ্চিত্র-নাটক দেখেছি। তবে নেশা বলতে যা বোঝায়, তা কখনোই হয়নি। স্কুলজীবনেও খেলাধুলার প্রতি তেমন আকর্ষণ ছিল না। বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেওয়া, তা-ও খুব কম। তবে গান আর বই—শিশুকাল থেকেই এ দুটোর প্রতি ছিল আমার প্রবল আকর্ষণ। বই পড়া ছিল আমার নেশা। তবে আমাদের সময়ে মুরুব্বিরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পড়া অপরাধ মনে করতেন। তাই গল্প-উপন্যাস পড়তে হতো সবার চোখের আড়ালে, লুকিয়ে। কতবার যে ধরা পড়ে শাস্তি ভোগ করেছি তার হিসাব নেই।
শিশুকালে রূপকথার বইয়ের চেয়ে আমি গোয়েন্দা বই পড়তে বেশি ভালোবাসতাম। মনে পড়ে পাঁচকড়ি দের লেখা রহস্য উপন্যাস ‘নীল বসনা সুন্দরী’ পড়ে কত রাত ঘুমোতে পারিনি। রাতে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলে খাট থেকে নামতে পারতাম না ভয়ে। মনে হতো, খাটের নিচে কে যেন লুকিয়ে আছে। হারিকেনের আলো-ছায়ায় মনে হতো, ওই তো কে যেন হেঁটে গেল। এত ভয়ের কারণ কাউকে বলতেও পারতাম না। শশধর দত্তের ‘মোহন সিরিজ’ ক্লাস সিক্সে থাকতেই শেষ করেছি।
তবে সেই যুগে একটা দিকে আমি খুব ভাগ্যবতী ছিলাম, সে হলো দাদা-দাদি, জ্যাঠা-চাচা ও ফুফুবেষ্টিত যৌথ সংসারে আমার শৈশব কাটেনি। বলা যায়, আমি একটা সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যেই বেড়ে উঠছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার বাবার অকাল মৃত্যুতে আমার জীবনটা বদলে গিয়েছিল।
বাবা-মা (বিমাতা), চার বোন, চার ভাই নিয়েই ছিল আমাদের সংসার। বাবা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনাসম্পন্ন, সংস্কৃতিমনা প্রগতিশীল ব্যক্তি। আমার বড় দুবোনকে পড়িয়েছেন কলকাতায় বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গালর্স হাইস্কুলে। আমি যেহেতু ছোট, তাই বাবার কর্মস্থলে ঘুরে ঘুরে অনেক স্কুলে পড়েছি। তাঁর আদর স্নেহের কথা কখনো ভুলতে পারি না। মনে পড়ে শীতের রাতে আমার গায়ের লেপ সরে গেলে বাবা আলতো করে গায়ের ওপর ছড়িয়ে দিতেন লেপটা। তাঁর স্নেহের পরশ এখনো যেন অনুভব করি।
বাবা অভিনয় করতে ভালোবাসতেন। প্রচুর মঞ্চনাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। যেখানেই যান সেখানেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলেছেন। কালীপূজা ও দুর্গাপূজার সময় এলাকায় যাত্রানুষ্ঠান ও পালাগানের আসর বসাতেন। আবার মহররমের সময় বসাতেন পুঁথিপাঠ, জারি ও সারি গানের আসর। সেকালের বিখ্যাত অভিনেতা শিশির কুমার ভাদুড়ী, অহীন্দ্র চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করেছেন বাবা। বঙ্গে বর্গী, ঈশা খাঁ, চন্দ্রগুপ্ত, মিশর কুমারী, জমিদার দর্পণ, স্বর্ণলঙ্কা, কৃষ্ণকুমারী, নীল দর্পণ ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করেছেন মুখ্য চরিত্রে। বাবা গানও পছন্দ করতেন খুব। গ্রামোফোন কিনেছিলেন, সেটিও আমাদের সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলে ঘুরত। বইপড়ারও পরিবেশ তৈরি করেছিলেন তিনি। কার্যোপলক্ষে কলকাতায় গেলেই মায়ের জন্য আনতেন সওগাত, প্রবাসী, মোহাম্মদী, শনিবারের চিঠি ইত্যাদি। আমাদের জন্য আনতেন দেব সাহিত্য কুটিরের শিশুসাথী, অরুণ বরুণ, সন্দেশ, বর্ষবাণী ইত্যাদি সংকলন। সঙ্গে নিজের জন্য আনতেন শচীন দেব বর্মণ, সায়গল, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কানাকেষ্ট, আব্বাস উদ্দিন, কানন বালা ও রবিন মজুমদারের সদ্য প্রকাশিত গ্রামোফোন রেকর্ড। ফলে প্রচুর গান শোনার সৌভাগ্য আমারও হয়েছে।’
জানতে চেয়েছিলাম লেখালেখি সম্পর্কে। বললেন, ‘আমার লেখা শুরু বলতে গেলে শৈশব থেকেই। কোনো পত্রপত্রিকায় নয়, খাতার পাতায়। অর্থাৎ সবার অলক্ষ্যে খাতার পাতায় মনের কথা লিখে রাখা, যেমন দুঃখ, কষ্ট, রাগ, ক্ষোভ, অভিমান আবার আনন্দ সবই লিখে রাখতাম। ছোটবেলায় খুব চাপা প্রকৃতির ছিলাম বলেই হয়তো আমার ভেতরে একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। তাই এ খাতার পাতায় লেখার বিড়ম্বনাও কম পোহাতে হয়নি। স্কুলে এবং ঘরে বেশ কয়েকবার ধরা পড়ে শাস্তি পেতে হয়েছে। ব্যাঙ্গাত্নক কটু বাক্যও কম হজম করতে হয়নি। এতে মনে যত কষ্ট পেয়েছি, লেখার আগ্রহ ততই বেড়েছে। অবশ্য এ জন্য পড়তেও হয়েছে প্রচুর।’
মুশতারী শফীর প্রথম লেখা গল্প ছাপা হয় দৈনিক আজাদের মুকুলের মাহফিলে। তখন তিনি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। লিখেছিলেন স্বনামেই। গল্পটি প্রকাশের পর তাঁর যে অনুভূতি তা আজীবন মনে রেখেছেন তিনি। কিন্তু যে নামে লেখাটি ছাপা হয়েছিল সেই নামটি এখন কারও কাছেই পরিচিত নয়। বিষয়টা তিনি খুলে বললেন এভাবে— ‘এটা একটা মজার ব্যাপার ছিল। বিদ্যালয়ে সবার কাছে আমি মুশতারী। আর ঘরে ডলি। কিন্তু ওইটুকু আমার নাম নয়। আগেই বলেছি বাবা আমার নামটা রেখেছিলেন বিশাল বড় করে, মোছাম্মাত উম্মে কুলসুম মুশতারী বেগম ওরফে ডলি। কিন্তু স্কুলে কিংবা বাড়িতে কেউ কখনো আমাকে পুরো নামে ডাকেনি। কেবল স্কুলে হাজিরা ডাকার সময় শিক্ষক যখন পুরো নাম ডাকতেন তখন অন্য মেয়েরা হাত মুখে দিয়ে ফিক ফিক করে হাসত। আমাদের সময় স্কুলে মুসলিম মেয়ে খুব কম ছিল। আমার ক্লাসে দু-তিনজনের বেশি ছিল না। বাকি সব হিন্দু মেয়ে। তাদের নাম সব সময়ই ছিল ছোট। মুসলিম যে কজন ছিল, তাদের নামও তত বড় নয়—হালিমা খাতুন, সখিনা বেগম, মর্জিনা আক্তার এ রকম। বাবা কেন অতবড় নামটা আমার রাখলেন ভেবে কূল পেতাম না। নিজেও অত বড় নামটা লিখতে বিরক্তিবোধ করতাম। তাই গল্প-ছড়া লেখার বেলায় নাম সংক্ষিপ্ত করে ফেললাম মুশতারী বেগম। বিয়ের পর স্বামীর ইচ্ছায় বেগমকে মুশতারীর আগে এনে মুশতারীর পরে শফী জুড়ে দিলাম। ফলে আমার নামের অর্ধাংশ পরিচিতির আড়ালে রয়ে গেল। এতে লাভ বই ক্ষতি হয়নি। আমি তো নামটাকে চিরতরে বর্জন করিনি। আমি সেই প্রথম গল্পটা লিখেছিলাম আমার নামের প্রথম অংশ উম্মে কুলসুম নামে। এতে লাভ হয়েছিল, কেউ জানল না লেখাটি আমার। আমিও লজ্জা-সংকোচের হাত থেকে রেহাই পেলাম। তবে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আনন্দ অনুভূতিটাই ছিল আলাদা। সবার আড়ালে কতবার যে আজাদ পত্রিকাটি বুকে চেপে ধরেছি বলতে পারব না। কত শতবার যে নিজের লেখাটি পড়েছি তারও হিসাব নেই। সেই স্মৃতি মনে করলে আজও অনুভবে জাগে সেই অনুভূতি। উৎসাহ পেয়ে আবারও লিখি বাড়িতে পোষা বিড়ালকে নিয়ে একটি গল্প। এভাবেই আমার লেখকজীবন শুরু। এরপর কচিকাঁচার আসর, খেলাঘর, বেগম ইত্যাদিতেও লিখি উম্মে কুলসুম নামে। বিয়ের পর বেগম মুশতারী শফী লিখতে শুরু করলেও উম্মে কুলসুম আমাকে ছেড়ে যায়নি, সে ফিরে এলো জীবনের চরম দুুসময়ে একাত্তরে।
স্বাধীন বাংলা বেতারে আবার ওই নামেই লিখতে শুরু করি কথিকা, জীবন্তিকা, নাটিকা। ওই নামেই বেতারে স্বকণ্ঠে পাঠ করেছি কবিতা, কথিকা এবং অভিনয়ে অংশ নিয়েছি নাটকে। কারণ তখন আমার স্বামীর একমাত্র ছোটভাই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দী। যদি তাঁরা বেঁচে থাকে আর পাকিস্তানিরা বুঝতে পারে আমি শব্দসৈনিক হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে যোগ দিয়েছি, তাহলে ওদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে—এ আশঙ্কায় আমার বহুল পরিচিত বেগম মুশতারী শফী নামটি গোপন রেখেছিলাম।’
মুশতারী শফী ছিলেন ষাটের দশকে চট্টগ্রামে মেয়েদের নিয়ে প্রকাশিত একমাত্র মাসিক পত্রিকা বান্ধবীর সম্পাদক (১৯৬৩-১৯৭৩), একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে লিখে গেছে অবিরাম। এরই মাঝে নারী শিক্ষার অগ্রগতি, দারিদ্র বিমোচন ও সংস্কৃতির প্রসারের লক্ষ্যে বান্ধবী সংঘ নামে একটি সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালে স্থাপন করেন ‘মেয়েদের প্রেস’ নামে একটি ছাপাখানাও যেটি পরিচালিত হতো মেয়েদের নিয়ে। এত সৃজনশীল কাজের প্রেরণার উৎস কি? এসব প্রশ্নের জবাব: ‘জীবনে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেয়ে লেখক সৃষ্টিকারী-আবিষ্কারক হতে চেয়েছিলাম। আমার মনে এ রকম বাসনার উৎস হলেন সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন ও বেগম সম্পাদিকা নূর জাহান বেগম। এ দুজনকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, সেদিন থেকে এই বাসনা আরও তীব্র হয়েছিল। আজকের বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতিমান অনেক লেখক-লেখিকার স্রষ্টা পিতা-পুত্রী মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন ও নূরজাহান বেগম। তো আমি সে পথই অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ষাটের দশকে একটি মাসিক পত্রিকা বান্ধবী সম্পাদনার মাধ্যমে। আমার সেই যাত্রাপথ রুদ্ধ করে দিল একাত্তর। কেবল পথ রোধ করা নয়, গোটা জীবনটাই আমার এলোমেলো করে দিয়েছিল ১৯৭১ সাল। তবে বান্ধবীর প্রকাশনা সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও আমার লেখকজীবনের ইতি ঘটেনি, বরং আরও বেড়ে গিয়েছিল লেখার গতি। তখন দিন রাত লিখেছি। কখনো স্বাধীন বাংলা বেতারের জন্য, কখনো ভারতের পত্রপত্রিকা বিশেষ করে আনন্দবাজার ও বসুমতি পত্রিকার জন্য। কখনো আকাশবাণী কলকাতা থেকে প্রচারের জন্য।
সেখানে লিখতাম অনেক রাত অবধি পার্কের বেঞ্চিতে বসে লাইটপোস্টের নিচে। কারণ কলকাতায় যে বাড়িতে আমরা কয়েক পরিবার শরণার্থী থাকতাম, সেই বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন ছিল বিচ্ছিন্ন। তাই কেরোসিন ও মোমবাতির খরচ বাঁচানোর জন্য পার্কের লাইটপোস্টের নিচে বসে লিখতাম। এ সবই আমার লেখকজীবনের অভিজ্ঞতা। তারপরও নিরঙ্কুশ সাহিত্যচর্চা বলতে যা বোঝায়, তা কি আমি পেরেছি? আমার মনে হয়, না। কারণ দীর্ঘ দিন তো আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রামের মধ্যেও সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে হতে হয়েছে নানা সমস্যার সম্মুখীন। তার ওপর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হলো নতুন সমস্যা।
১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে ঘাপটি মেরে থাকা যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের উত্থানের সুযোগ দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পরিণামে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ধর্মের নামে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা। ঘটানো হয়েছে মৌলবাদী সংগঠনের বিস্তার, বেড়েছে ফতোয়াবাজদের তৎপরতা, নারী নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনা। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে যুবসমাজ। বেকারত্ব, দুর্নীতি, হতাশা, নীতিহীন নষ্ট রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন— এ সবই আমাকে সারাক্ষণ এতই অস্থির ও অসুস্থ রাখে যে, মাঝে মাঝে আমার হাতের কলমও যেন শক্তি হারায়।
এর আগেই বলছিলাম, আমার লেখকজীবনের অভিজ্ঞতার কথা। ৭১-এর ধকল কাটিয়ে ৭৩-এ নতুন উদ্যমে শুরু করেছিলাম সেই বান্ধবী পত্রিকাটির প্রকাশনার কাজ। শুধু অর্থাভাবে সম্ভব হলো না তা টিকিয়ে রাখা। অকালমৃত্যু ঘটল বান্ধবীর, আর আমাকে জীবিকার তাড়নায় নিতে হলো চট্টগ্রাম বেতারে লেখকের চাকরি। হলাম পেশাদার লেখক। কিন্তু সাহিত্যচর্চার নেশা কাটেনি! শত ব্যস্ততার মাঝেও আমার কলম থেকে বেরিয়ে এলো কিছু গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও স্মৃতিকথা। এসব জড়ো করে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ১২টি বই। (এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর তাঁর আরও ১০টি গ্রন্থ বেরিয়েছে।) পড়ে আছে আরও অনেক লেখা। প্রতিদিনই ডায়েরির পাতায় কিছু না কিছু লিখছি। এগুলোকে সাহিত্য বলা যাবে না জানি। তবু এ লেখা থামাতে পারি না। এভাবেই একাত্তরের ডায়েরি সংরক্ষণ করতে গিয়েই স্বাধীনতা আমার রক্ত ঝরা দিন বইটি লেখা হলো। ১৯৯০ সালে চার মাস ইউরোপ ভ্রমণকালে যে ডায়েরি লিখেছি, সেটাই আমি সুদূরের পিয়াসী’ নামে ভ্রমণকাহিনী হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৯২-৯৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে প্রতিষ্ঠিত একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে প্রতিদিন যে ডায়েরি লিখতাম, সেই ডায়েরি অবলম্বনেই রচিত হয়েছে চিঠি: জাহানারা ইমামকে বইটি। কী হতে চেয়েছিলাম আর কী হলাম তার কিছুটা আগেই বলেছি। তবু আবারও বলছি, হতে চেয়েছিলাম পত্রিকার সম্পাদক, কিন্তু হলাম লেখক। দীর্ঘ ২৫ বছর বেতারে পাণ্ডুলিপি লেখক (পরে চিফ স্ক্রিপট রাইটার) পদে চাকরির পর অবসর নিয়ে নিজ ভবনে একটি কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠা করে সেটি পরিচালনা করছি আর যুক্ত আছি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে। লেখালেখিও চলেছে পাশাপাশি।’
মুশতারী শফীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে গল্পগ্রন্থ-‘দুটি নারী একটি যুদ্ধ’, ‘শঙ্খচিলের কান্না’, ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, ‘বিপর্যস্ত জীবন’, উপন্যাস-‘একদিন এবং অনেকগুলো দিন’, ‘বেলা-অবেলা’, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ- ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’, প্রবন্ধগ্রন্থ-‘আমার প্রতিরোধের আগুন।’
কথা হয়েছিল প্রেম-ভালোবাসা, সংসার জীবন এবং জীবনের চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ণতা-অপূর্ণতা ও অর্জন নিয়ে। বলছিলেন: ‘প্রেম ভালোবাসা? সে তো প্রতিটি মানুষের জীবনে একটা সময়ে আসে। আমার জীবনে সেই সময়টা আসার আগেই অভিভাবকেরা আমাকে বিয়ে দিয়ে ফেললেন। হ্যাঁ, বন্ধু-বান্ধবী আমার অনেক আছে। প্রেম বলতে যা বোঝায়, সে সুযোগ আমার জীবনে হয়নি। আমি কেন? সে যুগে রক্ষণশীল পরিবারের কোনো মেয়েরই সে সুযোগ ছিল না। পর্দা করতে হতো। আপন ভাই, চাচা, মামা ছাড়া যেকোনো আত্মীয়ের সামনে যাওয়া ছিল নিষিদ্ধ। কাজেই প্রেম করে বিয়ে করার প্রশ্নই আসে না। আর আমার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধের আইনটা একটু বেশি কড়া ছিল। কারণ আমি মাতৃ-পিতৃহীনা। অভিভাবকদের গলগ্রহ হয়ে ছিলাম। তাই আমার বিয়েটাও হয়েছে তাঁদের ইচ্ছা ও পছন্দে।
সংসারের ভালো-মন্দের কথা জানতে চান? সে কী আর বলবো। বিয়ে হয়েছিল খুবই অল্প বয়সে, সংসার কাকে বলে তাই তো বুঝতাম না। যাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, তিনি ছিলেন বয়সে আমার চেয়ে প্রায় আড়াইগুণ বড়। আমার ছেলেমানুষিও ছিল এক-আধটু। তা তিনি সামলে নিতেন। বড় রকমের ভুল হলে একটু বকাঝকাও করতেন। কখনো কখনো অভিমানে কেঁদেকেটে খাওয়া বন্ধ করেছি। তিনিই আবার আদর করে, বুঝিয়ে খাইয়েছেন। পড়ালেখার ব্যাপারে প্রচন্ড আগ্রহ ও স্বপ্ন থাকলেও তা পূরণ হয়নি। তবে বিয়ের পরে যেটুকু পড়েছি, সে-ও তাঁরই অবদান।
একসময় সংগীতশিল্পী হওয়ার ইচ্ছেও জাগে মনে। ভর্তি করে দেন সংগীত পরিষদে। বাড়িতেও রাখলেন ওস্তাদ শিবশঙ্কর মিত্রকে। সেতার শিখেছি সৌরিন্দ্র লাল ওরফে চুলু বাবুর কাছে। এস্রাজ শিখেছি অনিল বরণ চৌধুরীর কাছে। রবীন্দ্রনাথ ধর ওরফে কালাবাবুর কাছে শিখেছি রবীন্দ্রসংগীত। আবার একসময় গিটারের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। আমার শিক্ষক হলেন এএস মণ্ডল। অর্থাৎ আমার কোনো ইচ্ছেই অপূর্ণ রাখেননি স্বামী। কিন্তু আমি কোনো কিছুতেই সফল হতে পারিনি। সে ব্যর্থতা আমার। তিনি ছিলেন উদার প্রগতিশীল সংস্কৃতিমনা। নারীশিক্ষা, নারীর স্বাধীনতা, নারী প্রগতিকে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি আমাকেও শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেকোনো কাজে উৎসাহিত করতেন।
আমি ভারতের অনেক রাজ্য ভ্রমণ করেছি। এ ছাড়া, ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশও ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। আমার ‘সুদূরের পিয়াসি’ বইটিতে মূলত ইউরোপ ভ্রমণের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের অনেক খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকসহ বিশিষ্টজনের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ হয়েছে আমার। কারও কারও একান্ত স্নেহ-সান্নিধ্য পেয়েছি। সেদিক থেকে আমি ধন্য।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন দেশের স্বাধীনতা। মানুষের জীবন কখনোই পরিপূর্ণ হয় না। কোনো না কোনো ইচ্ছে বা সাধ অপূর্ণ থেকে যায়। আমার জীবনেও অনেক অপূর্ণতা আছে। কিন্তু তার জন্য দুঃখ করি না। কবির ভাষায় বলি—
‘কি পাইনি তার হিসাব মিলাতে/ মন মোর নহে রাজি
আজ হৃদয়ের ছায়াতে আলোতে/বাঁশরি উঠিছে বাজি।’
আমার প্রবল ইচ্ছে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যাওয়ার এবং সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ধর্মের শিকলমুক্ত করে প্রকৃতই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখে যাওয়ার। ৭২ এর সংবিধানের মূল চরিত্রে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। সেই ইচ্ছা পূর্ণ হবে সে আশায় রইলাম। (প্রসঙ্গত, মুশতারী শফী গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন এবং জীবদ্দশায় তাঁর প্রথম ইচ্ছে অর্থাৎ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন এবং রায় কার্যকর হয়েছে)
আমার সবচেয়ে ভালো লাগে যখন দেখি দেশের সরকার এমন কিছু কাজ করছে যাতে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ও শান্তি বিরাজ করছে। আর সবচেয়ে খারাপ লাগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শঠতা ও জাতির সঙ্গে মোনাফেকি এবং নেতাদের কথায় ও কর্মে অমিল দেখলে।
মুশতারী সফী রাজনীতির মাঠেও সক্রিয় ছিলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। শহীদ হয়েছেন তাঁর স্বামী ও ভাই। এসব নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কণ্ঠ ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে তাঁর। বললেন, ‘এসব বলতে গেলেও দীর্ঘ ইতিহাস হবে। তবে সংক্ষেপে বলি, আমি গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিলাম। ১৯৫৮ সাল থেকে আইউব বিরোধী আন্দোলন, নারী আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে চূড়ান্ত গণআন্দোলন, ৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সব কিছুতেই আমি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম। ৭১ এর ২৬ মার্চ ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার গোপন পরিকল্পনা গড়ে ওঠে আমার বাসভবন মুশতারী লজে এবং প্রতিষ্ঠাতা ১০ জনের পাঁচজনই এখানে অবস্থান করেন ৩০ মার্চ পর্যন্ত।
এ ছাড়াও ট্রাকভর্তি অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিবাহিনীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয় এখানে। পরে আমার স্বামী ডা. মোহাম্মদ শফী ও আমার একমাত্র ছোটভাই এহসান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে আমি অনেক কষ্টে সন্তানদের নিয়ে ভারতের আগরতলায় চলে যাই। সেখানে প্রথমে আশ্রয় নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাদান, উদ্দীপনামূলক বক্তব্য দেওয়াসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা কাজে যুক্ত হই। পরে কলকাতায় গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের একজন শব্দসৈনিক হিসেবে যোগ দিই। সেখানে নাটক, আবৃত্তি, কথিকাপাঠ ইত্যাদিতে অংশ নেই। মুক্তিযুদ্ধে আমার পরিবারের তিনজন শহীদ হয়েছেন। আমার স্বামী, ছোট ভাই ও আপন বড় ভগ্নিপতি।

এ দীর্ঘজীবন চলার পথে শিশুকাল থেকে এ পর্যন্ত যাঁদের সাহায্য, সহযোগিতা, অনুপ্রেরণা পেয়েছি তাঁদের মধ্যে বলতে হয় প্রথমে আমার বাবার কথা। পরে স্বামী, তারপরে রাজনীতিবিদ পূর্ণেন্দু দস্তিদার, চৌধুরী হারুন অর রশিদ, সাদেক নবী, তাঁর স্ত্রী মাসুদা নবী (মিনু আপা) ও বেলাল মোহাম্মদ। এঁদের আমৃত্যু আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব।
আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের ও আনন্দের স্মৃতি হলো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর- যেদিন কলকাতায় বসে শুনলাম পাকিস্তানি বাহিনী ৯৩ হাজার সৈন্যসহ ঢাকায় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে আমাদের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করছে। অর্থাৎ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ঘোষিত হলো। আর সবচেয়ে দুঃখের ও বেদনার স্মৃতি হলো আমার স্বামী ও আমার একমাত্র ছোট ভাইকে চিরতরে হারানোর ঘটনা।’
সুখ-দুঃখের বর্ণাঢ্য জীবনে ব্যাপক সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন মুশতারী শফী। বিভিন্ন পদে আসীন ছিলেন-উদীচী চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, থ্যালাসেমিয়া সেবাকেন্দ্র, রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলন পরিষদ, ডায়াবেটিক সমিতি ও হাসপাতাল, খেলাঘরসহ অনেকগুলো সংগঠনে।
সম্মাননা, পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন প্রায় অর্ধশত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-বেগম রোকেয়া পদক, বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলেশীপ, মহান একুশে সম্মাননা পদক (চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, বেগম রোকেয়া সম্মাননা, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা পদক, খেলাঘর সম্মাননা, বীর কন্যা প্রীতিলতা পদক ও সম্মাননা, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা ইত্যাদি।
মুশতারী শফীর তিন ছেলে, চার মেয়ে। সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
