হোম » স্বাধীনতার পর প্রথম একুশের সংকলন চট্টগ্রাম থেকে

স্বাধীনতার পর প্রথম একুশের সংকলন চট্টগ্রাম থেকে

শাহরিয়ার পারভেজ

শাহরিয়ার পারভেজ

স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারিতে একুশের প্রথম স্মরণিকা প্রকাশিত হয় চট্টগ্রাম থেকে। স্মরণিকাটির নাম ছিল ‘শেষ থেকে শুরু’। ‍‍‍‍‍আমরা কজন দেওয়ানবাজার চাটগাঁ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদক ছিলেন লেখক ও নাট্যকার সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী। সহ-সম্পাদক অঞ্জন কান্তি দাশ। প্রকাশক দীপক দাশ। মুদ্রক সুভাষ দত্ত, দি ইন্টার্ন প্রেস নন্দনকানন।

স্মরণিকা প্রকাশনার ব্যাপারে সহযোগিতায় ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের তৎকালীন আরও কিছু অগ্রণী মুখচ্ছবি। ছিলেন সৌমন কান্তি দে, তপন কান্তি দত্ত, অরবিন্দু চৌধুরী, প্রদীপ দেওয়ানজী, আরতি সেন, সমীর কান্তি চৌধুরী, সমীর সাহা, ফজলুর রহমান, অমলেন্দু বড়ুয়া, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, মো. সিরাজদ্দৌলা ও মিলন কান্তি গুপ্ত, এবং অমর বিন্দু চৌধুরী (বিডি নিউজ ২৪ ডট কম চট্টগ্রাম সাংবাদিক মিঠুন চৌধুরী’র পিতা)। পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন শিশির বিন্দু দাশ, শ্রীনাথ সাহা, হেমেন্দ্র লাল দাশ, কালিপদ পারিয়াল, রনধীর দাস, পরিমল বিকাশ সেন গুপ্ত, মনোরঞ্জন চৌধুরী, মুকন্দ লাল দাশ, আবদুস সোবহান চৌধুরী, আবু সাঈদ ও মোস্তফা কামাল।

তৎকালীন নিউ মার্কেটের নিচতলার ইস্টার্ন ফটোগ্রাফিক এজেন্সিস এবং দেওয়ান বাজারের জনকল্যাণ ফার্মেসি দুটো বিজ্ঞাপন দেয় প্রকাশনার জন্য। বাকি টাকা সবাই যে যার সামর্থ্য মত দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, দেওয়ান বাজারের আবদুস সোবহান চৌধুরী  সোবহান চেয়ারম্যান) একশ টাকা দিয়েছিলেন। তখনকার ১০০ টাকা আজ অনেক টাকা। কবি জিন্নাহ চৌধুরী ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর উপস্থাপনা ও গ্রন্থনায় সংকলনটি নিয়ে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে  সংকলনটির সম্পাদক সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী সংকলনটির ইতিহাস তুলে ধরেন।

কবিতা, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথায় সমৃদ্ধ এই সংকলনের সব কটি লেখার বাক্য বিন্যাস অপূর্ব। মোট ২৪ পাতার অনন্য সংকলনটির মূল্য রাখা হয়েছিল তিনটি দশ পয়সা। সম্পাদকীয় লিখেছেন সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী। কবিতার সূচিতে – ‘একুশের গান’ (মাহবুব উল আলম চৌধুরী), ‘একুশ ও অতঃপর’ (অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক), ‘রক্তে আমার মা’ (ইউসুফ পাশা), ‘হারিয়ে যেতে চাই’ (প্রদীপ দেওয়ানজী), ‘সাক্ষী দিনটি’ (সৌমেন কান্তি দে), ‘অম্লান সেদিন’ (শফিকুল মান্নান), ‘অনন্ত দিনের ধ্বনি’ (সুভাষ দত্ত), ‘এখনো কেন’ (সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী)। প্রবন্ধ লিখেছেন ‘আরো কয়েক পা’ (অধ্যাপক তপন চক্রবর্তী, ‘ভাষা প্রসঙ্গে’ (অঞ্জন কান্তি দাশ), ‘চেতনার প্রশ্নে’ (অমর বিন্দু চৌধুরী)।

প্রিন্টার্স পেজের পরের পাতা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা দিয়ে শুরু-

কোটি কোটি ছোট ছোট মরণেরে লয়ে,

বসুন্ধরা ছুটিছে গগনে,

অঞ্জলি ভরিয়া বিশ্ব মৃত্যু

উপহার

ঢালিতেছে কাহার চরণে;

এ ধরণী মরণের পথ,

এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ, যত বর্ষ বেঁচে আছি

তত বর্ষ মরে গেছি মরিতেছি প্রতি পলে পলে;

জীবন্ত মরণ মোরা, মরণের ঘরে থাকি

জানি না মরণ কারে বলে!

কবিগুরুর পাশাপাশি পুরো সংকলন জুড়ে আছে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল

ইসলাম, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হানের কবিতা আর উদ্ধৃতি।

‘একুশের শহীদেরা চলে গেছে

রক্তবীজ বুনে’

বিশটি বছর ধরে আমরা ঢেলেছি তাতে যন্ত্রণার জল

এখন ভরেছে মাঠ আদিগন্ত

চারিদিকে সোনার ফসল’

কবিতা দিয়ে শুরু সংকলনটির। প্রথম কবিতা ছিল কবি, সাংবাদিক এবং

ভাষা সৈনিক একুশের প্রথম কবিতার কবি

মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী’র একুশের গান।

কবিতার পরে আছে অধ্যাপক তপন চক্রবর্ত্তী’র‘ আরো কয়েক পা’ শীর্ষক প্রবন্ধ।

“অন্ধকার! ঘন জমাট অন্ধকার!! অন্ধকারের কণাগুলো রাতের থামে লেপ্টে আছে। যেন কত যুগ ধরে লেগে আছে তার সাথে। একটি পাখীও আজ শব্দ মেলে না। পালক ঝরে না। পাতাও নড়ে না। একটু শব্দও নেই। একি! পাখীও কি বাচ্চাকে সোহাগ দিচ্ছে না? ‘কালো কালো ছায়া নামে মুখে বেঁধে যায় চুমু!’ একেবারে শব্দ নেই।” হাজারো প্রশ্নের মাঝে উত্তর খোঁজার চেষ্টা। আছে এগিয়ে যাবার প্রত্যয়।

একুশের জয়গান নিয়ে অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক লিখেছেন ‘একুশ ও তারপর’ শীর্ষক কবিতা।

‘একুশ’ একটি চেতনা-সূর্য

ইতিহাসের উৎক্রান্তির সার্থকতায়

সে সমুজ্জ্বল, পরিপূর্ণ।

শোষণের ইতি শোষিতের দাবীতে

‘একুশ’ জয়গাথা সে শোষিতের জয়গান –

বিশ্ব যেথায় মানব প্রেমের স্রোতে,

শান্তি যেথায় বিরাজি আপন মনে,

ভাষা যেথায় খেলিছে কোলে কোলে

(মায়ের ক্রোড়ে শিশুটি যেমন)

শোষণ তার নিষ্ঠুর

গতি নিয়ে করেছিল নৃত্য………..

ভাষা নিয়ে লিখেছেন অঞ্জন কান্তি দাশ। ভাষা প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘ইতিহাসের পাতা হইতে পাওয়া জীবের জন্ম শুরু হইবার পর পরই, ভাষার জন্মের নিদর্শন আমরা খুঁজিয়া পাই। কারণ মানব জীবনের উপলব্ধি, চৈতন্য ও অনুভূতির বিকাশ মানবের সৃজিত ভাষার মধ্যে। ভাষা ছাড়া মানব জীবন ছন্দহীন, বোবা, পঙ্গু।’ ভাষা শহীদদের অকাতরে নিজের শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে নিজেদের উৎসর্গ করাকে উপজীব্য করে ইউসুফ পাশা ‘রক্তে আমার মা’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন-

‘একদিন বুড়িগঙ্গার সেই সাদা পানি

বুকের রক্ত দিয়ে ওরা লাল করে গেল।

আজ আমরা সেখানে রক্তস্নান করে,

রক্তভেজা পা ফেলে ফেলে

বাংলার গলা জড়িয়ে মায়ের আদল

ভেবে চুমু খেতে চাই।’

সংকলনটির প্রতিটি পাতায় দেশ মাতৃকার প্রতি অম্লান ভালোবাসা যে কারো নজর কাড়বে। এটি শুধু সংকলন নয়। দেশের প্রতি, ভাষার প্রতি, শব্দের প্রতি আমাদের ভালোবাসা।

প্রাবন্ধিক অমর বিন্দু চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধের শেষাংশে প্রজন্মকে নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ঠিক এভাবে, – ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কোন ঘটনাকে পালন করিতে গিয়া কয়েকটি গান বা নাটকের মধ্যে প্রকাশ করা যায়। সংবাদপত্রে প্রবন্ধ আর কবিতার মাধ্যমে সমাজের সীমিত গণ্ডির উপর আঘাত হানা যায়। কিন্তু তাহা কয়টি মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হইতেছে? সুতরাং গালভরা বড় বড় বুলি না আওড়াইয়া আমাদের জীবনে আত্মোপলব্ধি ও আত্মচেতনার বিকাশ ঘটাইয়া, সমাজের বুকে তাহা প্রতিফলিত করিয়া এই পবিত্র ভূমিতে অত্যাচারের যে ঘৃণ্য আঁচড় পড়িয়াছে তাহা মুছিয়া দিবার প্রয়াসে আগাইয়া আসাই আমাদের বাঙ্গালীত্ব শোধের প্রকৃষ্ট প্রকাশ বলিয়া পরিগণিত হইবে।’

অমর বিন্দু চৌধুরী ছাত্রাবস্থায় নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর তিনি শরণার্থী হিসেবে ফাজিলপুর সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরার উদয়পুরে চলে যান। সেখানকার জোলাবাড়ি ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আবার লেখাপড়া শুরু করেন এবং পরে চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১০ সালে অবসরে যান।

 ‘হারিয়ে যেতে চাই’

‘এই ব্যতিক্রম অনুভূতির যন্ত্রণা থেকে

আমি হারিয়ে যেতে চাই কোন রুদ্ধ

 গুহার নিকষ তমাসায়।

যেখানে-পলাশের ম্লান বর্ণ মায়ের বুকে

বুলেট বিদ্ধ কঙ্কালের হাসি

গভীর জলরাশিতে বিম্বিত উড্ডীন

শকুনের প্রতিচ্ছবি আমার অনুভূতির

মিছিলটাকে অবিন্যস্ত করে দেবে না।

যেখানে-আমার কর্ণকুহরে আছড়ে

পড়বে না সন্তান হারা মায়ের কান্না

ধর্ষিতা নারীর করুণ আর্তনাদ।

যেখানে -আমার নিমীলিত আঁখির

সম্মুখে ভাস্বর হয়ে উঠবে

উন্নিদ্র সবুজ সময়ের মায়ের হাসি, পাখীর বুলি

ফুলের গন্ধে পলাশ কুড়ানোর স্মৃতি।

‘হারিয়ে যেতে চাই’ শীর্ষক কবিতাটির লেখক প্রদীপ কান্তি দেওয়ানজী। এই সংকলনটির প্রকাশনার সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন প্রথম থেকেই। বিশিষ্ট নাট্যজন, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব- প্রদীপ দেওয়ানজী নামেই তাঁকে সবাই জানেন। স্কুলজীবন থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন তিনি। সম্পর্কে তিনি সুদীপ কান্তি দেওয়ানজীর ছোট ভাই। বর্তমানে দৈনিক আজাদী পত্রিকার ফিচার সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

সৌমেন কান্তি দে রচিত ‘সাক্ষী দিনটি’ কবিতার চরণগুলো আমাদের নিয়ে যায় বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সেই রক্তমাখা দিনটিতে।

‘ঝক ঝকে আগুন!

কচি কাঁচা কয়েকটি পলাশ টুপটাপ ওই।

সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার…

কালো গলা পীচ লালে লাল,

বারুদের ক্লেদাক্ত গন্ধভরা বাতাসটুকুর

ক্ষীণ সংলাপ, সাক্ষী দিনটি।’

কবি শফিকুল মান্নান এর ‘অম্লান সেদিন’ কবিতায় একাত্তরের উদাত্ত আহ্বান।

‘যুদ্ধ যেন শেষ হয়েও হয় না।

আবার এলো ফিরে

সংগ্রামের বজ্র নির্ঘোষে সেদিন।

অদম্য প্রাণ ¯পন্দন মৃত্যুর মুখোমুখি প্রতিশ্রুত

কতগুলো তরুণ-যুবক।

চক্রান্তে চক্রান্তে কালো সাপের প্রচণ্ড ছোবলে,

রিক্ততার সাহারায় আগুনের ফুলকি লয়ে

সবেগে ছুটছে

আপনারে ভুলে সম্মুখ পানে,

না-তারা থামবে না।

তারপর। সেই রাজপথ

যেন তীব্র হতে তীব্রতর,

দেহখানি তার বহ্নির রঙ্গে রঞ্জিত।’

‘অনন্ত দিনের ধ্বনি’ কবিতায় একুশ নিয়ে জয়গান গেয়েছেন কবি সুভাষ দত্ত।

দীর্ঘ দিনের যত অর্গল

একুশের চলার পথে-

ভেঙ্গে গেছে চিরতরে

মুক্ত প্রাণের দুর্জয় শপথে।

মিছিলে মিছিলে জনতার কণ্ঠে

‘একুশ’ অনন্ত দিনের ধ্বনি

যুগ-যুগান্তরে আঁধার পথে

যত ক্লান্ত, প্রাণের সঞ্জিবনী।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘শেষ থেকে শুরু’ সংকলনটির প্রচ্ছদ ও সম্পাদকীয় লিখেছিলেন লেখক ও নাট্যকার সুদীপ দেওয়ানজী। এই সংকলনে তাঁর কবিতাটি ছিল সবার শেষে। আজ ৫৪ বছর আগে একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের যে চিত্র ছিল তা আজো আমরা দেখতে পাই। তার ছবি ফুটে উঠেছে সুদীপ দেওয়ানজী’র ‘এখনো কেন’ কবিতায়-

‘শহীদ দিবসের জমাট অনুষ্ঠানে

বক্তার কণ্ঠে অনলবর্ষণ;

শরীরে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সু¯পষ্ট বিজ্ঞাপন।

গতানুগতিক পরিসরের বিতর্ক

বাংলার সংস্কৃতি আবেদনে দুর্বল-এর পক্ষে।

তাই কি অযুত শহীদের অতৃপ্ত আত্মার

আর্তনাদ আছড়ে পড়ছে

আমাদের রূদ্ধ দ্বারে?’

বছরের পর বছর এভাবে আর কত দিন ভাষা শহীদদের অবমাননা হবে। যাঁরা একদিন বিবেকের তাড়নায় নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে। তাঁদের এই

নিঃস্বার্থ দান কেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না। আমাদের আত্মসচেতনতা কখন ফিরবে? কবি জিন্নাহ চৌধুরী ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর উপস্থাপনা ও গ্রন্থনায় সংকলনটি নিয়ে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে  সংকলনটির সম্পাদক সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী সংকলনটির ইতিহাস তুলে ধরেন।

ভাষা আন্দোলনকে জানুন, সর্বস্তরে মাতৃভাষা প্রচলন করুন। ৭২ সালে যেমন অন্ধকারের অমানিশা ছিল তেমনি আজ, এখনো সেই অন্ধকারে ডুবে আছি। কিন্তু আমাদের পথ চলতে হবে। খুঁজে নিতে হবে আলোকরেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *